উইকেটে রান আছে করার সামর্থ্য নেই

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৫ এএম

উৎপত্তি জাপানে হলেও রিকশাকে আপন করে নিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের রাজধানী রিকশার শহর, স্বপ্নের মেট্রোরেল চালু হলেও এখনো মধ্যবিত্তের কাছে প্রিয় তিন চাকার এই স্বল্পগতির বাহন। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় ঢুকে গেছে রিকশা পেইন্টিং, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দশম আসরের লোগোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই নকশা। সেই মর্যাদা রাখতেই বোধহয় বিপিএলে ব্যাটসম্যানরা রান তুলছেন রিকশার গতিতে। প্রথম পাঁচটা ম্যাচের চারটিতেই দলীয় সংগ্রহ দেড়শও ছাড়ায়নি। শীতে দর্শকরা জমে গেলেও জমে ওঠেনি বিপিএল। তবে এবার অন্তত ব্যাটসম্যানরা রান না হওয়ার পেছনে উইকেটের দোষ দেখছেন না বরং মেনে নিয়েছেন নিজেদের সামর্থ্যরে অভাবকেই।

সোমবার দিনের প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত ঢাকা ২০ ওভারে করে ৮ উইকেটে ১৩৬ রান। গোটা ইনিংসে ১১টা মাত্র চারের মার, কোনো ছক্কা নেই। টি-টোয়েন্টির মেজাজের সঙ্গে যা একদমই বেমানান। এই রান তাড়া করতে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স খেলেছে ১৮.২ ওভার পর্যন্ত, হারিয়েছে ৪ উইকেট। তাদের ইনিংসে ১২টা চার, ৪টা ছয়। পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছেন নাজিবউল্লাহ জাদরান, ১ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় করেছেন ১৯ বলে ৩২ রান। এর আগে আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচেও এই আফগান ব্যাটসম্যান সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ১৭৭ রান তাড়ায় ৩০ বলে ৬১* রানের ইনিংস খেলেছিলেন, মেরেছিলেন ৫টা ছক্কা আর চারটা বাউন্ডারি।

প্রথম পাঁচটা ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি হয়েছে ৫টি, তার ভেতর সত্যিকার অর্থে টি-টোয়েন্টি সুলভ ইনিংস বলা যায় জাদরানেরটাই। জাকির হাসান যদিও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস (৭০*)-এর মালিক, তবে তিনি খেলেছেন ৪৩ বল আর ৬ মেরেছেন মাত্র একটি। আইপিএলের একদম প্রথম ম্যাচটায় ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ৭৩ বলে ১৫৮* রানের খুনে ইনিংসটাই এঁকে দিয়েছিল গোটা প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ মানচিত্র। বিপিএল দশম আসরে এসেও বৈশ্বিক মানচিত্রে দাগ কাটতে না পারার অন্যতম কারণ টি-টোয়েন্টির বিপরীত মেজাজের ব্যাটিং। অতীতে মিরপুরের উইকেটের ওপর দোষ চাপিয়ে অনেক সময়ই ব্যাটসম্যানরা পার পেয়ে গেছেন। এইবার বিসিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ভালো উইকেট হবে। উইকেট যে ভালো তাতে সম্মতি দিচ্ছেন ক্রিকেটাররাও, সেই সঙ্গে রান করতে না পারাটা সামর্থ্যরে অভাব বলেই মেনে নিচ্ছেন। প্রথম পাঁচ ম্যাচের ভেতর দুটো ম্যাচ খেলেছে দুর্দান্ত ঢাকা। দলটির অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে খোলাখুলি স্বীকারই করলেন, ‘উইকেট খুবই ভালো ছিল আজ। পাওয়ার প্লের পর থেকে উইকেট খুব ভালো ছিল। আবহাওয়া ফ্যাক্ট, এই জন্য উইকেটটা এমন আচরণ। আমার মনে হয়, উইকেট এবার ভালো আছে। রান যে হচ্ছে না সেটা ব্যাটসম্যানদের সীমাবদ্ধতা। আমরা আসলে ভালো ব্যাটিং করিনি, বিশেষ করে পাওয়ার প্লেতে। যখন ৪ ওভারে ১১ রান থাকবে তখন ঐ জায়গা থেকে খুব বেশি বড় রান আশা করাটা ভুল।’ মোসাদ্দেক মেনেই নিলেন আগের আসরের চেয়ে এবার উইকেট ভালো, ‘আগের আসরগুলোতে উইকেট নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল, এইবার কিন্তু আসলেই ভালো উইকেটে খেলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৫টা ম্যাচ হয়েছে, উইকেট নিয়ে অভিযোগের খুব একটা জায়গা নেই। অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব, আমরা যদি রান না করতে পারি তাহলে দর্শক থেকে শুরু করে সবাই হতাশ হবে। আজকের (সোমবার) যে উইকেট ছিল তাতে আমরা ব্যাটসম্যানরা যদি ঠিকঠাক ব্যাটিং করতে পারতাম তাহলে ১৭০-১৭৫ রানের উইকেট ছিল।’

তিনদিনই খেলেছে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স। দুটো রাতের ম্যাচের পর কাল দিনের প্রথম ম্যাচটায় তারা মাঠে নামে। ৪০ বলে ৪৯ রান করে ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন চট্টগ্রামের তানজিদ হাসান তামিম। ম্যাচের পর তামিম বললেন, ‘দিনের বেলা  উইকেটে বল একটু স্পিন হয়, গ্রিপ করে আসে। রাতের বেলায় কুয়াশার কারণে উইকেট একটু ভেজা ভেজা থাকে, বল স্কিড করে।’ তামিমও মানলেন উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক। লাস্ট ম্যাচটা (খুলনার বিপক্ষে, ১২১ রানে অলআউট) আমরা খুব খারাপ ব্যাটিং করেছি। এটা উইকেটের দোষ বা অন্য কিছু না। রাতের খেলায় কিন্তু ঠিকই রান হচ্ছে। দিনের খেলাটা লো-স্কোরিং হচ্ছে।’

রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ম্যাচের পর ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক তামিম ইকবালও বলেছিলেন, ‘আমি যখন ব্যাট করতে যাই তখন খুব চমৎকার উইকেট ছিল, পেস বল সুন্দর ব্যাটে আসছিল স্পিনেও আহামরি কোনো কিছু হয়নি। একটা দুইটা অড বল ঘুরেছে।’

এমন উইকেটে প্রতিপক্ষ সমীহ জাগানো কোনো বোলার না থাকার পরও রান যে হচ্ছে না তার অন্যতম কারণ ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্যরে অভাব। ভালো শুরুকে বড় ইনিংসে রূপান্তর করতে না পারার অক্ষমতা। খুলনা-বরিশাল ম্যাচেই ৯ বলে ২২ রান করার পর অহেতুক রান আউটে উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেন সৌম্য সরকার, ৪০ রান করতে তামিম খেলেন ৩৩ বল। বরং সংস্করণের চাহিদা মেনে ৩৯ বলে ৬৮* রানের  ইনিংস খেলেছেন মুশফিকুর রহিম, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিকে যিনি বিদায় বলে দিয়েছেন ২০২২ সালে।

ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর পরিচিতি নেই, তারকা ক্রিকেটারদেরও উপস্থিতি নেই। বিপিএলের আসরটা জমিয়ে তুলতে পারত টানটান উত্তেজনার ম্যাচ, বাহারি সব চার-ছক্কার মার। সূচনালগ্নে সেসব অনুপস্থিত বিপিএলে। নাকি রিকশা আর্টের সঙ্গে সংহতি প্রকাশেই রান তোলায় এই রিকশার গতি!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত