হাসপাতালের ‘ক্যানসার’

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

দেশে ক্যানসার আক্রান্তদের সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে একমাত্র ভরসা রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। কিন্তু এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। বারান্দা, করিডর ও টয়লেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তূপ ও দুর্গন্ধ। বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর ক্ষেত্রে সিরিয়াল জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। ক্যানসার হাসপাতাল যেন নিজেই অব্যবস্থাপনার ‘ক্যানসারে’ আক্রান্ত! বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘শতকোটি টাকার যন্ত্র বিকল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার খরচ বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। ফলে ক্যানসার আক্রান্ত সাধারণ মানুষ মূলত এখানেই ছুটে আসে। কিন্তু যন্ত্রপাতি না থাকায় কিংবা বিকল থাকায় সঠিক সময়ে, সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করা রোগীরা। ফলে চিকিৎসার মাঝপথে বা চিকিৎসা শুরুর আগেই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খুলনার বাসিন্দা তাহমিনা আমিন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত। গত ৭ জানুয়ারি রেডিওথেরাপি নিতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। খুলনায় কেমোথেরাপি দেওয়া হলেও সেখানে রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা না থাকায় তাকে ঢাকায় আসতে হয়। কিন্তু জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে বলা হয়, তাহমিনাকে পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হবে। দুদিন ঘুরে একজনকে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তিনি ১৭ জানুয়ারি সিরিয়াল পেয়ে যান। হাসপাতাল থেকে তাকে বলা হয়েছিল মেশিন নষ্ট থাকায় আপাতত সিরিয়াল নেই। কিন্তু তাকে যত দ্রুত সম্ভব থেরাপি নিতে বলেছেন চিকিৎসক। সে কারণে বাধ্য হয়ে দালালকে টাকা দিয়ে সিরিয়াল নিতে হয়েছে তাকে। পরিহাস হচ্ছে ক্যানসারের ধরন ও বিস্তার অনুযায়ী, চিকিৎসা নির্ধারণ করেন চিকিৎসকরা। সাধারণত অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসা করা হয়। তবে তিনটি ধাপের এই চিকিৎসায় একটির পর একটি কত দিন পর নিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। ফলে একটির পর আরেকটি চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি হলে তা কার্যকর হয় না।

ক্যানসার রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার দরকার হয়। জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের রেডিওথেরাপির ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি পুরোপুরি বিকল। বাকি দুটিও কখনো কখনো বিকল হয়ে পড়ে। একেকটি মেশিনের দাম ২৫-৩০ কোটি টাকা করে। ক্যানসার নির্ণয়ের অন্যতম যন্ত্র এমআরআই বিকল হয়ে পড়ে আছে। নেই এক্স-রে, সিটিস্ক্যান মেশিনও। যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় এখানে বায়োপসিসহ ক্যানসার নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পরীক্ষা করা যায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকটবর্তী এই হাসপাতালটির সেবার সুযোগ ও মান দিনে দিনে ধসে যাচ্ছে। সরকারি এই ক্যানসার হাসপাতালে ব্যবহার না করে ফেলে রাখায় যন্ত্রপাতি নষ্টের উদাহরণ আরও আছে। ক্যানসার হাসপাতাল ঘিরে গড়ে উঠেছে দালালচক্র। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ের কর্মী,তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোগান্তি এড়াতে ও দ্রুত চিকিৎসা পেতে বিত্তবানরা বিদেশমুখী হচ্ছেন। বাংলাদেশ আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস ফোরামের (বিওটিওএফ) হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে আট লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। এতে খরচ হচ্ছে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের সিংহভাগই ক্যানসারের রোগী। দেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। বিশ্ব সংস্থা সংস্থার মানদ- অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে একটি ক্যানসার কেন্দ্র দরকার। সেই হিসাবে দেশে ক্যানসার কেন্দ্রের প্রয়োজন ১৬০টি। তবে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আছে ৩০টিরও কম। এসব ক্যানসার হাসপাতালও আবার রাজধানীকেন্দ্রিক। ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি যেখানে দুই হাজার টাকা, সেটা বাইরের বেসরকারি হাসপাতালে করতে লাগছে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে ৮০ ভাগই দরিদ্র। স্বাস্থ্য খাতে বড় দুর্নীতি হয়। ফলে ভোগান্তির শিকার হয় মানুষ। এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত