রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২ নম্বর নারী ওয়ার্ডের সামনে কথা হয় শরীয়তপুরের খায়রুল হুদার সঙ্গে। তিনি জানান, তার স্ত্রী সালমা আক্তার ৬ মাস ধরে পিঠের ব্যথায় ভুগছেন। প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে শুরুতে চিকিৎসকের কাছে গেলে গ্যাসের ব্যথা মনে করে ওষুধ দিতেন। এরপর এই হাসপাতাল, ওই হাসপাতাল ঘুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক ক্যানসার সন্দেহ করে এখানে পাঠান।
প্রচন্ড হতাশা নিয়ে খায়রুল বলছিলেন, ৯ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হলেও এখনো চিকিৎসা শুরু হয়নি। বিভিন্ন পরীক্ষা দিচ্ছেন চিকিৎসক। এখানে অধিকাংশ যন্ত্র নষ্ট থাকায় বাইরে থেকে করাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আজও একটা রিপোর্ট নিয়ে এসেছি। কিন্তু দুপুর ১২টা বেজে যাওয়ায় নার্স জানিয়েছেন আজ আর ডাক্তার রিপোর্ট দেখবেন না।’
খায়রুলের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয় গত ২১ জানুয়ারি। সেদিন পর্যন্ত তিনি জানতে পারেননি তার স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত কি না।
শুধু খায়রুল হুদার স্ত্রীই নন এই হাসপাতালে ক্যানসারের রোগীদের চিকিৎসাসেবার চিত্র এটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালে রোগীর যে চাপ, সে তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম। চিকিৎসকরা সকালে ওয়ার্ডে রোগী দেখতে যান। দুপুর ১২টা থেকে রিপোর্ট দেখতে বসেন। এত পরিমাণ রিপোর্ট জমা হয় যে অনেক সময় এক দিনে সব দেখা সম্ভব হয় না। তাই দুপুর ১২টার পর রিপোর্ট জমা দিতে নিষেধ করেছেন।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে ৩০০ থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে ২০০ শয্যা বাড়ানোর ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে যেখানে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট মিলিয়ে ২ হাজার ৮৫৮ জনবল প্রয়োজন, সেখানে আছে কমবেশি ১ হাজার ১৭৬ জন। জনবল বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে বারবার জানানো হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদর্শ জনবলের মানদন্ড অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালের জন্য ন্যূনতম ৩৭ জন অধ্যাপক প্রয়োজন। কিন্তু ক্যানসার হাসপাতালে রয়েছেন মাত্র ৪ জন। একইভাবে ৬১ জন সহযোগী অধ্যাপক ও ১২০ জন সহকারী অধ্যাপকের প্রয়োজন থাকলেও রয়েছেন মাত্র ১৩ ও ২৮ জন করে। ২৩৬ জন মেডিকেল অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও কাজ চালাতে হচ্ছে মাত্র ৬৭ জনকে দিয়ে। ৬৬ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। কমপক্ষে ৫ জন ফার্মাসিস্টের প্রয়োজন হলেও কাজ করছেন মাত্র ২ জন।
জনবল ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবু হেনা মোস্তাফা জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব ক্ষেত্রেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সারা দেশের রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। তাই প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি সংকট সমাধানের।’
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর ক্যানসার (আইএআরসি) বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ২৭০ জনের বেশি মানুষ ক্যানসারে মারা যায়। আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। সারা দেশে যেখানে প্রায় ১৮ লাখ ক্যানসার রোগী আছে, সেখানে সরকারিপর্যায়ে তাদের চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৯টি হাসপাতালে। এই ৯টি হাসপাতালের মধ্যে ক্যানসার হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই।
আক্রান্তদের মধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারা বেসরকারি হাসপাতাল ও দেশের বাইরে চিকিৎসা করালেও বাকিদের ভরসা শুধু সরকারি হাসপাতালগুলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে। এখানে প্রতিটি শয্যার বিপরীতে ভর্তির চাহিদার প্রায় সাতজন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই হাসপাতালে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দক্ষ টেকনোলজিস্টের। ক্যানসারের চিকিৎসা অন্য রোগের চিকিৎসার মতো নয়। এখানে যন্ত্রের ব্যবহার করতে হয়। দক্ষ টেকনোলজিস্ট না হলে ভালো রিপোর্ট আসবে না। হাসপাতালে এমন অনেক যন্ত্র আছে যা চালানোর মতো দক্ষতা তাদের নেই।
নারী ওয়ার্ডে কথা হয় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আছিয়া বেগমের সঙ্গে। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত এই নারী ১৫ দিন হলো এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলছিলেন, ‘সকালে ডাক্তার আসেন, মাঝেমধ্যে আসেন না। ডাক্তার দেখে যাওয়ার পর আর কারও দেখা মেলে না। কোনো বিষয়ে সাহায্যের জন্য নার্সের কাছে গেলে তারাও খারাপ আচরণ করেন।’
বোন ম্যারো বা হাড়ের মজ্জায় ক্যানসারে আক্রান্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার আলমগীর হুসেনের স্ত্রী সালমা বেগম। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে কেমোথেরাপি নেওয়ার জন্য ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালের বাথরুমে বাতি নেই, চার পাশে ময়লার স্তূপ। দুর্গন্ধে যাওয়া যায় না। ওয়ার্ড বয়রা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না।
ক্যানসার রোগীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, তাদের যেকোনো সময় সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এই হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট থাকার কারণে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ৮০-৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মচারী টাকা ছাড়া কোনো কাজ করতে রাজি হন না। এ নিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রায়ই তাদের বাদানুবাদ হয়। তারা রোগীদের ওয়ার্ডে রাখা ময়লার বোল পরিষ্কার করে দিতে হলে টাকা দাবি করেন, নিয়মিত ওয়ার্ডের মেঝে ঝাড়ু দেন না, মুছে দেন না। সব কটি ওয়ার্ডের বাথরুমের বাইরের মেঝেতে পানি জমে আছে। দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে বাথরুম ব্যবহার করতে হয়। এই আউটসোর্সিং কর্মচারীরা শয্যাবাণিজ্য, সিরিয়াল বাণিজ্য, ওষুধ বিক্রির দালাল চক্রের সঙ্গে জড়িত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আউটসোর্সিং কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মাত্র ১৭ হাজার ৬০০ টাকা বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু কোম্পানি জনপ্রতি ১-২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছে। রোগীদের থেকে যা আদায় করতে পারি তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে।’
ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি, বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ হুমায়ূন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে একটা মাত্র পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতালে যদি চিকিৎসক-নার্সের সংকট থাকে, তাহলে রোগীরা কোথায় যাবেন। তার ভাষায়, ‘ক্যানসার রোগীদের প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। অনেক রোগীই চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাচ্ছে।’
