আগামী মার্চ থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হবে উপজেলা নির্বাচন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে তারা উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেবে না। তাদের এমন সিদ্ধান্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে আসতে উৎসাহিত করবে বলে আওয়ামী লীগ মনে করছে। কিন্তু নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, তারা দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে তাকে বিএনপি ছাড়তে হবে, এখন পর্যন্ত এমন কঠোর সিদ্ধান্তে অনড় দলটি।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে আমরা রাজপথে রয়েছি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছি। আমাদের আন্দোলনের কর্মসূচি চলমান। এ অবস্থায় সরকারের অধীনে কোনো ধরনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তাভাবনা আমাদের নেই।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ‘দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করার যে সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নিয়েছে তাতে কোনো লাভ হবে না। কারণ দল তো কাউকে না কাউকে সমর্থন দেবে। কেন্দ্র যাকে সমর্থন দেবে সেই উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হবে। এখানে অন্য কারও নির্বাচন করে কোনো লাভ হবে না। আর আমরা আন্দোলনে রয়েছি। এখন নির্বাচন করার মতো পরিবেশ নেই।’ তিনি বলেন, ‘হামলা, মামলায় পর্যুদস্ত সারা দেশের নেতাকর্মীরা এখন আদালতের বারান্দায় দৌড়াচ্ছেন জামিনের আশায়। দীর্ঘদিন পরিবার ছাড়া এসব নেতাকর্মী পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চায়। তার বাইরে আমাদের চলমান আন্দোলন সংগ্রাম রয়েছে। সে সংগ্রামে অংশ নিতে হবে।’
তবে এর আগেও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে অংশ নিয়েছেন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতীক নিয়ে অংশ নেওয়া নির্বাচনের চেয়ে বেশি ইউনিয়ন পরিষদে জয় পেয়েছেন।
ওই সময়ও বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কমই দেখা গেছে। এ ছাড়া বহিষ্কার করা নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার জন্য বৈঠকও করেছেন শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
দেশে বিভিন্ন জেলার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর থেকে বিএনপি সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন করছে। মামলা-হামলায় পর্যুদস্ত সারা দেশের নেতাকর্মীরা ঘরবাড়ি ছাড়া। জামিনের জন্য আদালতের বারান্দায় দৌড়াচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। তাছাড়া দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি এবার উপজেলায় দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনে হয় না কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে দুয়েকজন আগ্রহ দেখাতে পারে।’
যুবদল নেতা সাইদ ইকবাল টিটু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি ভোলা। ভোলা বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে এলাকা ছাড়া। নেতাকর্মীদের বেশিরভাগ একাধিক মামলার আসামি। এ অবস্থায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে নির্বাচন তো দূরের বিষয়, প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না তারা। তাই উপজেলা নির্বাচনে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে, এমনটা মনে হয় না।’
গত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর জানিয়েছিলেন, রোজার ঈদের পরপরই যাতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয় সেইভাবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে মে মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা হবে।
এর আগে সোমবার রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা দেওয়া হবে না।
বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল। কিন্তু তারপর যে উপজেলা নির্বাচন হয়েছে সে নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। এবারও আগের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। এরপরও কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ইতিমধ্যে দলের হাইকমান্ড সতর্ক করে দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন হোক আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হোক, কোনো নির্বাচনই যে সুষ্ঠু হবে না তা বারবার প্রমাণ হয়েছে।’
গত বুধবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের যে সিদ্ধান্ত তা হচ্ছে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে আমরা যাব না। কারণ তার অধীনে কোনো নির্বাচন কখনো অবাধ, সুষ্ঠু হয় না। কখনো হবে না।’
উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার কারণ হিসেবে আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে আপনারা নির্বাচন দেখেছেন এবং সেই নির্বাচনের ফলাফল, সেই নির্বাচনের প্রকৃতি, সেই নির্বাচনের নানা ধরন-আঙ্গিক নিশ্চয়ই ধারণ করা আছে আপনাদের নিজস্ব মোবাইলে বা আপনাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে।’
২০২১ সালে থেকে ধাপে ধাপে হওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। ওই সময় চেয়ারম্যান পদে দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়ের হার ছিল প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ।
এর আগে ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে ছয় ধাপে ৪ হাজার ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি জয় পেয়েছিল ৩৬৭টিতে। অর্থাৎ দলটি ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদে জয় পেয়েছিল।
