মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। জান্তাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইয়ের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে। এমনকি সামরিক বাহিনীর সমর্থকদের অনেকেও তাকে দেখতে চাইছে না।
সূত্র বলছে, মিয়ানমারের নানা রাজ্যের সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্মিলিতভাবে দেশটির ৪৩ শতাংশ ভূখন্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেক জায়গায় স্বাধীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে বিদ্রোহীরা। জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তাড়া খেয়ে জান্তার অনুগত সেনারা এখন ক্রমেই কেন্দ্রের দিকে অর্থাৎ রাজধানী নেপিদোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে নেপিদোয় ফিরলেও স্বস্তি নেই সেনা ও কর্মকর্তাদের। কারণ সামরিক জান্তা যুদ্ধে থেকে পালিয়ে আসা সেনাদের সাজা দিচ্ছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) বেসামরিক সরকারকে উৎখাতের পর থেকে দেশের সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এখন অনেক সমর্থক তাকে দেশ শাসনের অযোগ্য মনে করছে। সম্প্রতি শান রাজ্যে ব্যাপকভাবে পর্যুদস্ত হয় জান্তার অনুগত বাহিনী। উপায়ান্তর না পেয়ে বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে সেনারা।
তবে মিয়ানমারের সেনারা এখন শুধু শান নয়, দেশের সব প্রান্ত থেকেই চাপে পড়েছে। বিদ্রোহীদের তাড়া খেয়ে অনেকে ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। গত মাস দুয়েক সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকবার সেনারা পালিয়ে ভারতে চলে যায়। পরে তাদের সামরিক শাসনের কেন্দ্র নেপিদোয় পাঠায় নয়াদিল্লি।
মোটকথা, জান্তার সেনারা এখন চাপে পড়ে নেপিদোমুখী। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সাবেক অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত ও লজ্জিত বোধ করছেন। অনেক বলছেন, যেসব কমান্ডার জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছে, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।
সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে জান্তার প্রশাসন। নেপিদোয় ছয়জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে সম্প্রতি যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই শান রাজ্য থেকে বিদ্রোহীদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসেন। এসব কর্মকর্তার পরিবারও ব্যাপক চাপের মধ্যে। মিয়ানমারে সেনারা এখন কার্যত উভয় সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন, কারেন, কারেন্নি রাজ্যে সেনারা অস্ত্র চালনা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। বিদ্রোহীদের আক্রমণ তারা টিকতেও পারছে না, আবার পালাতেও পারছে না। অস্ত্র চালনা কিংবা নিরপেক্ষ থাকার দোলাচলে দিন পার করছে। কারণ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে না লড়াই করে ফিরলে সাজার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র বলছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত কয়েক মাসে অনেক সেনা কর্মকর্তা ভারত ও থাইল্যান্ডে চলে গেছেন। এ অবস্থায় সামরিক শাসনের মধ্যে থাকা মিয়ানমারের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের (এসএসি)’ চেয়ারম্যানের পদ থেকে হ্লাইংয়ের পদত্যাগের দাবি উঠছে। ৩১ জানুয়ারি এ সংস্থার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অর্থাৎ শাসনযন্ত্র ঠিক রাখতে তাকে কয়েক দিনের মধ্যে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের (এনডিএসসি) বৈঠক আহ্বান করতে হবে।
গত সপ্তাহে উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু পাউক কো তাউ জান্তাপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন এবং ভাইস সিনিয়র জেনারেল সোয়ে উইনের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এই ভিক্ষু জান্তার সমর্থক হিসেবেই পরিচিত। মান্দালায় রাজ্যের একটি শহরে তিনি একটি অনুষ্ঠানে ওই মন্তব্য করেন।
পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামরিক বাহিনীর সমর্থকরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লাগাতার সমালোচনা করে যাচ্ছেন হ্লাইয়ের নেতৃত্বের। মিয়ানমারে জান্তা সমর্থকদের মধ্যে এখন হ্লাইংয়ের বদলে সোয়ে উইনের প্রতি সমর্থনের জোয়ার দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ধারণাটি এমন হ্লাইংয়ের পরিবার বেশ দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত এবং তার তুলনায় সোয়ে উইন কিছুটা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির।
