রূপগঞ্জে ‘রফিক বাহিনীর’ হামলায় ৮ জন গুলিবিদ্ধ

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:২৮ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ‘রফিক বাহিনীর’ তা-ব চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রামে দুই দফা ৫০-৬০ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী সশস্ত্র হামলা চালায়। এতে আটজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। শিশু-নারীসহ আহত হয়েছে অন্তত ১৩ জন। সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও জমি দখলে বাধা দেওয়ায় এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও তার ভাই মিজানুর রহমানের উপস্থিতিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় কায়েতপাড়ার ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি মোতালেব ভূঁইয়ার বাড়িসহ আশপাশের সাতটি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে জমি দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে অসংখ্যবার নিরীহ মানুষের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, গতকাল বেলা ১১টায় রফিকের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগ নেতা মোতালেব ভূঁইয়ার বাড়িতে হাজির হয়। সন্ত্রাসীদের হাতে দেশি-বিদেশি পিস্তল, রামদা, চাইনিজ কুড়ালসহ ধারালো অস্ত্র ছিল। অস্ত্রের মহড়া দেখে নারী ও শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দুপুর ২টা পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা সেখানে অবস্থান করে বাড়ি দখলের চেষ্টা চালায়। এতে ব্যর্থ হয়ে বাড়ির সদস্য আলাউদ্দিন প্রধান (৫৫), আল-আমিন (২৮), তাজিল মিয়া (২৯), জাকির হোসেন (৫০), মোক্তার হোসেনসহ (৪৫) আটজনকে গুলি করে এবং লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে। গ্রামবাসীরা আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠায়।

মোতালেব হোসেনের ছেলে আনোয়ার হোসেন জানান, এ পর্যন্ত তাদের বাড়িতে দুই দফা সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। প্রথম দফায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হয়। পরে তাদের স্থানীয় রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এরপর আরেক দফা হামলা হয় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে। এ সময় হামলায় আহত হয় আরও পাঁচজন।

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুলিবিদ্ধ তাজিল বলেন, ‘রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিক আমাদের জমি দখল করতে চায়। কিন্তু আমরা জমি বিক্রি করতে চাই না। তাই রফিক ও তার ভাই মিজান বাহিনী নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ওপর যখন ওরা হামলা করেছিল, তখন ওদের সঙ্গে পুলিশ ছিল। পুলিশের সামনেই ওরা আমাদের ওপর গুলি চালায়।’

মারধরের শিকার বৃদ্ধা নাসিমা খাতুন বলেন, ‘আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে। ঘরের মধ্যে যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেছে। আমাদের নিজের বাড়িতে আমরা থাকতে পারি না। কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের সশস্ত্র ক্যাডারদের ভয়ে পালিয়ে থাকি। ওরা আমার ছেলেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করল। প্রশাসনের লোকের সামনেই আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে। সন্ত্রাসীরা বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে না। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?’

গুলিবিদ্ধ জাকির হোসেন বলেন, ‘জয়পুরহাট থেকে এসে দেখি আমার বাড়িতে হামলা হচ্ছে। রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম তার সন্ত্রাসীদের নির্দেশ দিয়েছে আমাদের এলাকা ছাড়া করতে। যদি না যাই তখন আমাদের মেরে ফেলতে বলেছে। আজকে (গতকাল) প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে আমাদের তারা গুলি করল। পুলিশ কিছুই বলল না।’

আহত মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আমাদের একমাত্র অপরাধ আমরা আমাদের বসতভিটা ও জমি কেন রফিক ও মিজানের কাছে বিক্রি করছি না। তাদের অন্যায় আবদার না শোনার কারণেই আমাদের মতো নিরীহ মানুষের ওপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। আমরা কোথাও গিয়ে বিচার পাচ্ছি না।’

নাওড়া গ্রামের বাসিন্দা আলেমা আক্তার বলেন, ‘রফিকের কথায় আমরা আমাদের বসতভিটা তার কাছে বিক্রি না করার কারণে আমাদের মতো নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে ধারাবাহিকভাবে লুটপাট ও হামলা চালানো হচ্ছে।’

আওয়ামী লীগ নেতা মোতালেব বলেন, ‘রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিক ও তার ভাই মিজানের নেতৃত্বে জসু, রুবেল, রহমান, মোজাম্মেলসহ ৫০-৬০ সন্ত্রাসী স্থানীয়দের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট করে। তাদের বাধা দিতে গিয়ে নাওড়ার প্রায় ১১ জন আহত হয়েছে। আহদের মধ্যে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলিবিদ্ধদের রূপগঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে রফিক ও তার বাহিনী। জমি দখল করতে স্থানীয়দের ওপর গুলি চালাচ্ছে। এখনই তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’

এ প্রসঙ্গে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, বিকেল ৩টা পর্যন্ত আহত অবস্থায় তিনজন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছে। এর মধ্যে দুজন ছররা গুলিবিদ্ধের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ছিল। এ ছাড়া আরও একজনের মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপক চন্দ্র সাহা জানান, নাওড়া গ্রামে সন্ত্রাসী হামলার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। এ কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলার ঘটনার কথা অস্বীকার করেন ওসি। তিনি বলেন, যাদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে এবং যেসব ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তারা আইনের আশ্রয় নিলে অবশ্যই তাদের পাশে থাকবে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত