প্রতিবাদের ইউনিক ভাষা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১৭ এএম

১৯৬৪ সালে ফরাসি লেখক ও দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই বলে যে, ‘নোবেলজয়ী’ উপাধিটা তার স্বাধীন শিল্পসত্তাকে ব্যাহত করবে। তা ছাড়া তার প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাও রয়েছে নোবেল প্রত্যাখ্যানের মূলে। এগারো বছর পর তিনি তার মত পরিবর্তন করেন এবং পুরস্কারের অর্থমূল্যের জন্য গোপনে যোগাযোগ করেন। কিন্তু নোবেল একাডেমি তার এই আবদারে কান দেয়নি দেরি হয়ে গেছে বলে। ২০১৬ সালে গীতিকবি ও কণ্ঠশিল্পী বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হয়। ১৬ দিন চুপচাপ থেকে অবশেষে তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করতে রাজি হন কিন্তু পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হাজির হননি। তবে পুরস্কারের অর্থমূল্য যাতে মিস না হয়ে যায় সেজন্য মাস চারেক পর একটি নোবেল-বক্তৃতা খাড়া করেন তিনি। পুরস্কারের অর্থমূল্য কে হারাতে চান?

সুনামে, স্বীকৃতিতে, অর্থমূল্যে নোবেল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তুল্যমূল্য বিচারে বাংলা একাডেমি পুরস্কার নস্যিতুল্য। এই দুইকে একবাক্যে নিয়ে আসাটা বোকামি। তবু ছোট পরিসরের ছোটখাট উজ্জ্বল ঘটনা বড় পরিসরকেও ম্লান করে।

কথাশিল্পী জাকির তালুকদার বাংলা একাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুরস্কারের অর্থমূল্যও ফেরত পাঠিয়েছেন। বিষয়টি ইউনিক। উল্লিখিত দুই বিশ্ববিখ্যাত লেখক যেখানে টাকার জন্য গোপনে হাত পেতেছিলেন কিংবা নত হয়েছিলেন নোবেল একাডেমির কাছে, সেখানে জাকির তালুকদার প্রকাশ্যে ফেরত দিয়ে দিলেন পদকসহ টাকাও। জাকির তালুকদার ছোট পরিসরের লেখক হলেও আচরণে বিশ^মানের। এই বিষয়টি আমাকে ক্লিক করেছে।

জাকির তালুকদার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেননি, ফেরত দিয়েছেন। প্রেম বা সম্বন্ধ প্রত্যাখ্যান করলে তেমন কথা থাকে না। কিন্তু বিয়ের পর সংসার-টংসার করে বউ ফেরত দিয়ে দিলে অনেক কথা ওঠে। জাকিরের ঘটনায় তাই কথা উঠেছে। কানাকানি হচ্ছে। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন ২০১৪ সালে। দশ বছর পর এমন কী ঘটল যে, সেই পুরস্কার তার কাছে হঠাৎ বোঝা মনে হলো? বিতর্কের সূত্রপাত এখানেই। জেগে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য না হলেও জাকির নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। পশ্চিমেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তবে ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় খুব কমই সংশ্লিষ্ট লেখক নেন। এ দায়িত্ব তার না, সমাজের। মিডিয়ার। উৎকণ্ঠিত সুশীলদের। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। পশ্চিমের লেখকরা সব বিষয়ে কথা বলেন না, দলবাজি করেন না, ধান্ধার পেছনে দৌড়ান না, ক্ষমতাবানদের পদলেহন করেন না। এ জন্য তাদের প্রতিটি উচ্চারিত কথাই দামি। সমাজ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং সেসব কথা ও অভিযোগের মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা চলে এবং পরবর্তী সময় সংশোধনের চেষ্টাও করে। জাকির তালুকদার তো পাশ্চাত্যের লেখক নন যে, তার কথার গুরুত্ব থাকবে।

তিনি এমন একটি দেশের লেখক, যেখানে অনিয়মই নিয়ম। যেখানে সত্য বললে সন্দেহ করা হয়, যেখানে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দুর্নীতির চাদরে ঢাকা, যেখানে লুটেপুটে খাওয়াই সংস্কৃতি, যেখানে হুমকি-ধমকি-তদবির আর স্বজনপ্রীতি করে মেডেল-পদক হাতিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে সামান্য প্রতিবাদ আর বিরুদ্ধ মত মানেই রাষ্ট্র ও চেতনাবিরোধী ট্যাগ সেখানে পদক ফিরিয়ে দেওয়া একটি নতুন অভিজ্ঞতাই বটে। বাঙালি এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত নয় বলেই জাকির তালুকদার কাণ্ড আমাদের কাছে অস্বাভাবিক ঠেকেছে। আমরা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজছি। মূল সুরের বাইরে গিয়ে আমরা বাঁশি বাজাচ্ছি। এক লাখ টাকা তো এই দশ বছরে বেড়ে কয়েক লাখ হওয়ার কথা, তিনি পুরস্কার কেন নিয়েছিলেন, এতদিন পর পুরস্কার ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্য কী, নতুন করে আলোচনায় আসার ধান্ধা, ইত্যাদি। বাজার ছেয়ে গেছে এসব কথায়। অভিনন্দিতও যে হচ্ছেন না, তা নয়। তবে সংখ্যায় সীমিত। জাকির তালুকদার এ জন্যই পরে বাধ্য হয়েছেন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিবৃতি দিতে।

জাকির তালুকদার তার পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে যে কারণগুলো উল্লেখ করেছেন, তা আতঙ্কের। এই কারণগুলো কি জাকির একাই জানতেন? আমার তা মনে হয় না। বাংলা একাডেমি প্রসঙ্গে আলাপ উঠলে বেশির ভাগ মানুষই নেতিবাচক কথা বলেন। অগণতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেওয়া একাডেমির দৃষ্টিগোচর কাজ মানে গ্রন্থমেলার আয়োজন ও শব্দের নতুন নতুন বানান বাজারজাত করা। পঁচিশ বছর যাবৎ কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন না করে পছন্দের লোকদের দিয়ে এডহক কমিটি গঠন করে এটিকে স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন এর পদস্থগণ। প্রতিবছর নিয়ম করে যে অপকর্মটি বাংলা একাডেমি করে যাচ্ছে, তা হচ্ছে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীবাজি। পুরস্কার প্রসঙ্গে জাকির তালুকদারের অভিযোগ, ‘গত কয়েক বছর ধরে পুরস্কারের একটি প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছে। যেমন কয়জন আমলা পাবেন পুরস্কার, বাংলা একাডেমির অন্তত একজন কর্মকর্তা পাবেন পুরস্কার আর মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ পাবেন পুরস্কার। নিশ্চয়ই যে কোনো পেশার লেখক পুরস্কার পেতে পারেন। কিন্তু যখন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের চেয়ে অধিকতর যোগ্য লেখককে বাদ দিয়ে পুরস্কারটা দেওয়া হয়, তখন তার সমালোচনা হবেই। অথচ একাডেমি কোনো সমালোচনায় কান দেয় না। আত্মসমালোচনা করে না। সেই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, কোনো কবি বা লেখকের কাজের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে তাকে অন্য ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। এগুলো সবই ভব্যতার ব্যত্যয়।’ গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ সত্যি হলে, বাংলা একাডেমি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। জাকির তালুকদার একজন প্রতিষ্ঠিত ও সুলেখক। সমাজ সচেতন নাগরিক। তিনি একাডেমিও পেয়েছেন। সুতরাং এট বলা অমূলক যে, তিনি পুরস্কার না পাওয়ার খেদ থেকে এমন অভিযোগ করেছেন। বরং উল্টোটা। তিনি পুরস্কার টাকাসমেত ফেরত দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার চেয়েছেন। সুতরাং তার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য। তিনি জানিয়েছেন, অনেক আগে থেকেই বিষয়গুলো নিয়ে কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন এবং কর্র্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোর যৌক্তিকতা স্বীকারও করেছে বলে জানা গেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। কেন হয়নি সেটা বাংলাদেশের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই বোধগম্য হবে।

শরীরে ব্যাধি হলে শরীরের কোনো কোষই সতেজ থাকে না। বাংলা একাডেমি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, বাঙালির মননের প্রতীক হয়েও নিজস্ব সত্তা নিয়ে আলাদা থাকতে পারেনি, এটা দুর্ভাগ্যের। ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাকির তালুকদারের প্রতিবাদ গ্রাহ্য হয়নি বলেই একজন লেখক হিসেবে তার সর্বশেষ সামর্থ্য প্রয়োগ করেছেন পুরস্কার ফেরত দিয়ে। আমি তার এই প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানাই। বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ রকম একটি আত্মত্যাগী প্রতিবাদ ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতোই। কিন্তু একটি ইতিহাস হয়ে থাকল। জাকির তালুকদার বাংলা একাডেমির কর্র্তৃত্ববাদী দেয়ালে একটি ছোট্ট ফুটো করতে পেরেছেন। সেই ফুটোতে চোখ রেখে বায়োস্কোপের মতো ভেতরের অনেক কিছুই দৃশ্যমান হলো। আশা করি আরও সচেতন মননশীল মানুষের প্রতিবাদে এই ফুটো বড় থেকে বড়তর হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, প্রচার ও গবেষণার লক্ষ্যে যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল এবং বহু বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিল সেই প্রতিষ্ঠানটিকে আবার তার আগের ঐতিহ্যে ফেরাতে হলে দেয়াল পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে হবে। জাতির মনন ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক যখন তামাশায় পরিণত হয় তখন সেই জাতি আর স্বরূপে থাকে না। ডামি জাতিতে রূপ নেয়। আসুন, আমরা এদিক-ওদিক না ঘুরে জাকির তালুকদার চিহ্নিত মূল পথে হাঁটার চেষ্টা করি। ঠিক পাশ্চাত্যের মতো। প্রকৃত কবি-লেখকরা যদি কোনো অস্বচ্ছতা, অসঙ্গতি কিংবা সংকটের কথা বলেন তখন সেটা সত্যি সত্যি অস্বচ্ছতা, অসঙ্গতি কিংবা সংকট। রাষ্ট্র বা সমাজের তখন উচিত হবে এসবের মেরামত করা। যিনি বা যারা সমস্যা চিহ্নিত করেছেন তার বা তাদের চরিত্র হরণ নয়।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক স্টকহোম, সুইডেন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত