প্রাণের মেলাটি মুক্তমনের হোক

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

অমর একুশে স্মরণে রেখে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস, বইমেলারও মাস। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও এর শহীদদের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত এই মাসব্যাপী বইমেলা বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক উৎসব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বইমেলা হয়। তবে সেসব বাণিজ্যিক বিপণন ও প্রচারের দরকারি প্রয়োজনে। এই বাস্তবতা ধরে রেখেই বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলা মৌলিকভাবে আলাদা। এর মূল প্রেরণা ভাষাশহীদদের স্মৃতি উদযাপন ও বাংলা ভাষার প্রতি অফুরান আবেগ। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিও ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা নিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

বরাবরের মতোই ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে বইমেলা। দেশ রূপান্তরে ‘প্রাণের মেলার দুয়ার খুলছে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করার পর ‘বাঙালির প্রাণের মেলার’ ৪০তম আসর খুলে দেওয়া হবে সর্বসাধারণের জন্য। আমরা চাই, আমাদের এই প্রাণের মেলাটি যেন মন ও মননের মেলা হয়ে ওঠে। যদিও কাগজের দাম দ্বিগুণ এবং বই মুদ্রণের অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম প্রায় দেড়গুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের দাম হবে ঊর্ধ্বমুখী। একই সংকটে বইয়ের সংখ্যা ও বিক্রিও কমে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন প্রকাশক-লেখকরা। প্রকাশকদের অভিযোগ, গত এক বছরে কাগজের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আড়াই গুণ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম এত বাড়েনি। কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বই প্রকাশের সংখ্যা অনেক কমবে এবং বইয়ের দাম বেড়ে যাবে বলে প্রকাশকরা যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তা অমূলক নয়।

এর আগে বইমেলার আয়োজন নিয়ে মন্ত্রণালয়ের এক প্রকার অযাচিত হস্তক্ষেপ লক্ষ করা গিয়েছিল। অবশ্য এবার দীর্ঘদিন পর বাংলা একাডেমি আবারও একক আয়োজনে ফিরেছে। বাৎসরিক এই বইমেলার আয়োজনের বাইরে বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ডের আর কোনো প্রতিফলন সাধারণের কাছে যেমন খুব একটা দৃশ্যমান নয়, তেমনি বিদ্যার্থী কিংবা গবেষকদের কাছেও একাডেমির আবেদন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। গত ১০ বছরে হাতেগোনা কয়েকটি কাজ বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান, আধুনিক বাংলা অভিধান, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা প্রকাশ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজ নেই বললেই চলে। যেহেতু ফেব্রুয়ারির এই মেলা অমর একুশের চেতনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাই মেলা নিয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অমর একুশের চেতনায় বাংলা একাডেমি বইমেলা আয়োজনকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সব মহলের আন্তরিকতারও প্রমাণ দিতে হবে।

বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, ১ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মেলা শুরু হবে সকাল ৮টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার এবং সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেলায় বই বিক্রি হবে ২৫% কমিশনে। এবার করোনার মতো মহামারী কিংবা তেমন কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। লিপইয়ার হওয়ায় মিলছে এক দিন বাড়তি সময়। সঙ্গে যোগ হয়েছে মেট্রোরেল সুবিধা। সব মিলে ভালো একটি মেলার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৭২ সালে মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমিতে চট বিছিয়ে এই বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে যখন এই মেলার আয়োজন শুরু করে, তখন ক্ষমতায় ছিল এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারী সরকার। পরে এই বইমেলা প্রাঙ্গণেই লেখক-শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ, লেখক অভিজিৎ রায় জঙ্গি হামলার শিকার হন। ডিএমপি অবশ্য এবারের মেলায় জঙ্গি তৎপরতার শঙ্কা নেই বলে নিশ্চিত করেছে। ফলে শুরু থেকেই বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্ত, গণতান্ত্রিক চেতনার শ্বাস-প্রশ্বাসের বিষয়। এই শ্বাস-প্রশ্বাস বহমান থাকুক। প্রাণের বইমেলা সার্থক নির্ভয় মুক্তমনের মেলা হয়ে উঠুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত