সোনাগাজীতে হুমকির মুখে কৃষি

মুরগির খামারের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনজীবন

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:২৮ এএম

ফেনীর সোনাগাজীতে লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামারের বর্জ্যরে দুর্গন্ধে পরিবেশদূষিত হয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা খামারের বর্জ্য নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ফেলা হচ্ছে খাল, ফসলি ও পতিত জমিতে। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল ও ফসলি জমি, হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করলেও রহস্যময় কারণে নীরব রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অফিস ও উপজেলা প্রশাসন।

এ উপজেলার আমিরাবাদ ও নবাবপুর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি খামার রয়েছে। এসব এলাকার খামারিদের বর্জ্য ফেলার নেই কোনো আধুনিক ব্যবস্থা। এ এলাকার মানুষ পরিবেশদূষণের মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে। এতে দূষিত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী। খামারিরা তাদের খামারের বর্জ্য দুই ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পেকুয়া খালে ফেলছেন। ফলে খালের অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকার পানি দূষিত হয়ে কালচে আকার ধারণ করেছে। যার কারণে খালের পানিতে চাষাবাদ হওয়া আবাদি জমি চাষাবাদের অনুপযোগী ও মাছ চাষ বন্ধ হয়ে পড়েছে। বায়ু ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সোনাগাজী উপজেলায় অনুমোদিত লেয়ার খামার ১০০টি, ব্রয়লার ৭০টি খামার রয়েছে। তবে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে পরিসংখ্যান থেকে তিন-চার গুণ বেশি খামারের অস্তিত্ব মিলেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। মুরগির বিষ্ঠা মাটিচাপা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা ইচ্ছে করেই খাল ও আবাদি জমিতে ফেলছেন। ফলে হাজার হাজার পথচারী ও এলাকার মানুষ দুর্গন্ধ নিয়ে জীবনযাপন করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সফরপুর গ্রাম ও নবাবপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের পেকুয়া খালের দুই পাশে অন্তত ৫০টি খামার রয়েছে। খামারের ডিমের খোসা, নষ্ট ডিম, মরা মুরগি ও ড্রেসিং করা মুরগির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পেকুয়া খাল ও পাশের আবাদি জমিতে। এসব বর্জ্যে পচা পানি আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয় এলাকাবাসী ও রাস্তার পথচারীদের। এ ছাড়া পচা বর্জ্য পানিতে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে পাশের কৃষিজমিতে। ফলে স্থানীয় কৃষকরা দূষিত পানির কারণে বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, নষ্ট হচ্ছে রোপণ করা ফসল। এর ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ফসল আবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন। একইভাবে চলছে উপজেলার সব কটি লেয়ার ও ব্রয়লার পোলট্রি খামারগুলো।

পেকুয়া খালপাড়ে ২০ বছর ধরে বসবাস করা ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ দুল্লব বিয়া বলেন, ‘এই খালের পানিতে আমরা গোসল থেকে শুরু করে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করেছি, প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরে খাওয়া ও বিক্রি করেছি। ১০ বছর ধরে খামারের বর্জ্যে খালের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। খালে মাছ তো দূরের কথা পোকামাকড়ও নেই। এর দূষিত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছি।’

সোনাগাজী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. লেবু লাল দত্ত পোলট্রি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না করায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে স্বীকার করে বলেন, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ির ২০০ গজের মধ্যে পোলট্রি বর্জ্য ফেলার নিয়ম নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ফেনীর উপপরিচালক শওকত আরা কলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু খামারের ছাড়পত্র রয়েছে। যদি খামারগুলো পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয় এবং পোলট্রির বর্জ্যে পরিবেশদূষণের লিখিত অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবেশ বিপর্যয় রোধ এবং কৃষি ও মৎস্য চাষের হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত