অনৈক্যের ক্ষতি

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:১৯ এএম

পৃথিবীতে আজ সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি মুসলমান। মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন, উপমহাদেশের কাশ্মীর, মিয়ানমার, চীনের উইঘুরসহ দেশে দেশে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছেন। ভূ-রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচে কোথাও জায়নবাদ, কোথাও উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং কোথাও কমিউনিস্টদের হাতে মুসলমানরা মারাত্মকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। উল্লিখিত বিষয়গুলোকে মুসলিম উম্মাহ বিজাতীয় আগ্রাসন বলে মনে করে। কিন্তু এর বাইরেও ইসলামের নীতি ও আদর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করতে গিয়ে জেল-জুলুম, হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মুসলিম নাগরিকরা। এ সংখ্যাও কম নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণে ধর্মহীন আদর্শ লালন করা ওই সব দেশের শাসকরা ভূ-রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ক্রীড়নকদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামের যথাযথ অনুসারী সাধারণ নাগরিক ও আলেম-উলামার ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাচ্ছেন। মুসলিম নামধারী ওই সব শাসকই আজ মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক সেজে বসেছেন। তারা ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে ইসলামি অনুশাসন, নীতি-নৈতিকতা; এমনকি আত্মপরিচয় বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত নন। গোটা মুসলিম উম্মাহকে তারা শত ধারায় বিভক্ত করে রেখেছেন। নির্যাতিত জনপদের মুসলমানদের কান্না তাদের হৃদয় স্পর্শ করে না। এ বিভক্তি ও অনৈক্য দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতনের কারণ বলে আমরা মনে করি। তাই আন্তর্জাতিক আদালতসহ কোনো দরবারে ধরনা দিয়েও হত্যা-নির্যাতন থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না মজলুম মুসলমানরা।

আমরা জানি, দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক আদালতের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় গণহত্যা বন্ধে ২৬ জানুয়ারি একটি মামলার রায় দিয়েছে। রায়ে আদালত গাজায় গণহত্যা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দিয়েছে। এ যেন শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো ব্যাপার। অবৈধ দখলদার ইসরায়েল, যারা বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাদের অবৈধ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করছে না, তাদেরই গণহত্যা বন্ধের দায়িত্ব দিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ কিংবা ঘাতকদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর শাস্তি ঘোষণা করেনি। আইসিজের রায় বা আদেশ মিশ্রপ্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। কারণ আদেশে গণহত্যা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া হলেও গাজায় অভিযান বন্ধের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। আদালতের আদেশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা এক মাসের মধ্যে আইসিজেতে জানাতে ইসরায়েলের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইসিজেতে শুনানির সময় দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে গাজায় জরুরি ভিত্তিতে ইসরায়েলি অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দিতে আবেদন জানানো হয়েছিল। তবে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি। এ নিয়েও আছে আলোচনা-সমালোচনা।

অবশ্য একটি পক্ষ মনে করছে, আইসিজের এই রায় ‘এক যুগান্তকারী রায়।’ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে তেলআবিবকে কড়া বার্তা দিতে দেখল সারা বিশ্ব। আইসিজের আদেশে বলা হয়, গাজায় গণহত্যা ঠেকাতে ইসরায়েলকে তার ক্ষমতার আওতায় মধ্যে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইসরায়েলের সেনারা যাতে গাজায় গণহত্যার মতো কোনো কিছু না করেন, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে গাজা উপত্যকায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুমতি দিতে হবে।

কিন্তু আমরা দেখছি, এ রায়ের পর গাজায় গণহত্যা বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে দখলদার ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এ আদেশ শুধু মিথ্যা নয়, বরং আপত্তিকর।’

আমার জানি, ইসরায়েল একটি ছোট রাষ্ট্র, তা-ও আবার অবৈধ। তারপরও গোটা মুসলিম বিশ্বের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। মানবাধিকার, নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করছে না। এ অবৈধ দেশটির চারদিকে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র থাকার পরও কেন পারছে না আশা করি এ সত্য উপলব্ধি করতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। আমরা মনে করি, মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব উম্মাহর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো শক্তিই ইসরায়েলের মতো অবৈধ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে পারবে না। শুধু গাজা উপত্যকা নয়, গোটা ফিলিস্তিনই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ফিরে পাবে। দেশে দেশে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার বন্ধ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দয়াময় আল্লাহতায়ালা আমাদের সহায় হোন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত