ত্যাগীদের ঋণ শোধ করতে চান প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৭ এএম

 

ক্ষমতায় থেকেও দলের যেসব নেতাকর্মীর মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি এবার সেই নেতাকর্মীদের ও তাদের পরিবারের প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্বাদশ সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য (এমপি) নির্বাচনে ত্যাগী নেতা ও ত্যাগী নেতার পরিবারকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা এমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন।

এ নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন, যাদের এখনো মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি, তাদের বিষয়টিও তার বিবেচনায় আছে। শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের মূল্যায়নের কথাও ভাবছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঋণ শোধ করে যেতে চান।

দেশের কোনো সংসদে সরকারি দলের এত বেশি সংরক্ষিত মহিলা আসন পাওয়া এবারই প্রথম। এতে করে মূল্যায়নের বাইরে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করার বিষয়ে জোর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২৩ আসনে জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দলের ৫৯ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া আরও তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ৫০টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৪৮টিতে সদস্য নির্বাচন করতে পারবে।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন ত্যাগী নেতা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ত্যাগী পরিবারের সদস্য দেখে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও তিনি বানিয়েছেন দলের প্রতি ত্যাগের মূল্যায়ন করে। সংরক্ষিত মহিলা সদস্যও নির্বাচন করেও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে। এ ছাড়া পদ-পদবিতেও ত্যাগের মূল্যায়ন করার পরিকল্পনা আছে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার।

গত ২৮ জানুয়ারি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের (এমপি) সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বলেন, দলের কিছু ত্যাগী নেতাকর্মী আছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে পারেননি। এই সংসদে সেসব নেতাকর্মী ও পরিবার দেখে মূল্যায়ন করবেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ত্যাগী-বঞ্চিত নেতাদের ঋণ শোধ না করতে পারার আক্ষেপের কথা বলে থাকেন। এসব বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এমনও বলেছেন, বয়স হয়ে গেছে, এখনো অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন যাদের ঋণ শোধ করতে পারেননি, এখন সুযোগ পেলেই তা করবেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে রাজনীতি করেছেন, কিন্তু মূল্যায়ন পাননি। আদর-সমাদর ও কদর কপালে জোটেনি, উল্টো মার খাওয়া, পদ কেড়ে নেওয়া, জেল-জুলুমের শিকার হওয়া সেসব নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মূল্যায়ন করা হবে এবার।

প্রধানমন্ত্রী তার সেই ঋণ শোধের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে দলের উপদেষ্টা পরিষদের প্রয়াত সদস্য রহমত আলীর মেয়ে রুমানা আলী টুসিকে এমপি ও মন্ত্রী করেছেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একসময়ের প্রভাবশালী নেতা প্রয়াত মকবুল হোসেনের (হাজী মকবুল) ছেলে আহসানুল ইসলাম টিটুকে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী করেছেন বাবার ত্যাগের বিবেচনায়। আঞ্চলিক নেতা হলেও প্রায় জাতীয় নেতার খ্যাতি পাওয়া চট্টগ্রামের প্রয়াত নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন আহমেদের ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে উপমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রীর পদ দিয়েছেন। এবারের মন্ত্রিসভায় বেশিরভাগ সদস্য এসেছেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মী যাদের ঘাম-শ্রম ও রক্তের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ বঞ্চিত, এমন খবর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বিচলিত করে। আক্ষেপ হয় তার।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা নেতাকর্মীদের অনেকের ত্যাগ ও বঞ্চনার কথা স্বীকার করেন। তারা বলেন, যারা ক্ষমতা পেয়েছেন তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার মনোবৃত্তি, দাপুটে হওয়ার বাসনা গত ১৪ বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মীকে বঞ্চিত করেছে। গত ১১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভাও নানা দিক মূল্যায়নে নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৩০টি মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে নেতাকর্মীদের ত্যাগের মূল্যায়ন করে।

নীতিনির্ধারণী নেতারা বলেন, দলীয় ফোরামের বিভিন্ন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে দুঃসময়ের নেতাদের ত্যাগের কথা তুলে ধরে আবেগতাড়িত হতে দেখা গেছে। সেসব বৈঠকে তিনি বলেছেন, যাদের ঘাম-শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে আজকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় সেসব নেতাকর্মীকে যারা বঞ্চিত করেছেন তাদের বঞ্চিত করবেন তিনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকার রেখেছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতার ১৫ বছরে যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন এবং নিজের দলের পুরনো ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে বাধ্য করেছেন, দুই অংশেরই তালিকা করেছিলেন দলীয় সভাপতি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সেই তালিকা ধরে বেশ কিছু আসনে প্রার্থী বদল করেছেন। কিছু আসনে নৌকা পেয়েও পরাজিত হয়েছেন। কিছু আসনে দূরে সরে যাওয়া ত্যাগী অনেক নেতার হাতেই পুরস্কার হিসেবে নৌকা তুলে দিয়েছেন। ঠিক উল্টো কারণে নৌকা ছিনিয়েও নিয়েছেন ৭১ এমপির হাত থেকে। চলতি বছর তৃণমূলের রাজনীতিতে ত্যাগী অনেক নেতাকে পদ-পদবি দেবেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে দূরে সরে যাওয়া, ঘরে উঠে যাওয়া অনেক নেতার হাতেই নৌকা প্রতীক তুলে দিয়ে এমপি বানিয়েছেন শেখ হাসিনা। পুরনো সব নেতাকে সসম্মানে দলীয় পদে রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

দলের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ফারুক খান বলেন, সারা দেশে দলের যেসব নেতাকর্মী বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে, দলের তাদের মর্যাদা দিতে দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিলেও যারা শোনেননি, তাদের ব্যাপারে তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নিয়েছেন। অনেক সাবেক এমপি মনোনয়ন পাননি শুধু এ কারণেই। তিনি বলেন, বঞ্চিত নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে আরও জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা জানিয়েছেন তিনি কারও ঋণ শোধ না করে বিদায় নিতে চান না। তিনি মনে করেন, ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এসে যখন দলকে সংগঠিত করতে মাঠেঘাটে ঘুরেছেন, তখন যারা খাটাখাটুনি করেছেন, মার খেয়েছেন, অত্যাচার সহ্য করেছেন, জেলে গিয়েছেন, তবু তাকে ছেড়ে যাননি তারাই প্রকৃত আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা বলেছেন, সেসব দিনের সব কথা তার মনে আছে। অনেকের ঋণই তিনি শোধ করেছেন। বাকি যাদের কাছে এখনো ঋণী, তাদের ঋণ শোধ করেই বিদায় নেবেন।

একাধিক জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবের কথা জানার পর সারা দেশেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন ক্ষমতাবানরা, যারা কখনো খোঁজ নেননি।

এই নেতারা আরও বলেন, ‘এমপিগিরি’ টিকিয়ে রাখতে ১৪ বছরে যারা ব্যক্তি বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি করেছেন, তারা এখন দূরে চলে যাওয়া নেতাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। শুধু চেয়ার ঠিক রাখতে, ঘরে ফেরা নেতাদের মান ভাঙাতে সাধ্যমতো সব চেষ্টাই করে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপিদের ছড়ি ঘোরানোর রাজনীতি বন্ধ হয়েছে। আগামীতে আরও পরিবর্তন আসবে।’ তিনি বলেন, গত আগস্ট মাস থেকে গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের নেতাকর্মীদের কথা শোনার পর এমপিদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। তারা ত্যাগী নেতাদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। গত পাঁচ বছর যেসব এমপি পুরনো অনেক নেতার রাজনীতি করার পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেই এমপিরা এখন দলের ত্যাগী নেতাদের ঘরে গিয়ে কড়া নাড়ছেন। রাগ-ক্ষোভ, দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতে হাত ধরে বিশেষ অনুরোধ করছেন।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লা খান বলেন, অনেকেই আছেন ক্ষমতা পেয়েছেন। কিন্তু নেতাকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বা ভালোমন্দ খোঁজখবর রাখেননি। তারা এখন সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলতে চাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এবার রাজনীতিতে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের গুরুত্ব বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত