ভারত দাবি করেছে, টাঙ্গাইলের শাড়ি বাংলাদেশের নয়; বরং এই অতি বিখ্যাত পণ্যটির উৎস সে দেশটি। জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআইয়ের তকমা দাবি করেছে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি। ইতিমধ্যেই এই সংবাদ প্রকাশে, বাংলাদেশের নেটিজেনসহ দেশ-বিদেশের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। যে পণ্যটির নামই বাংলাদেশের একটি জেলার নামে, সেই পণ্যের দাবিদার ঘোষণায়।
বিশ্বায়নের যুগে, কোনো সুবিখ্যাত পণ্যের এই দাবি এবং শেষতক জিআই পাওয়াটা সে দেশের বাণিজ্যের জন্য বিপুল মুনাফা নিয়ে আসে। একে তো উৎস দেশ থেকে পণ্য কেনাটাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৈধতা পায়, উপরন্তু ভোক্তারাও এর জন্য বেশি দাম দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, অন্য দেশগুলো কেবল কম অর্থই পায় তা নয়, কখনো কখনো জরিমানার শিকার হতে পারে ‘নিষিদ্ধ’ পণ্য বিক্রির লক্ষ্যে। এর বাইরেও অন্য দেশে পণ্যটি উৎপাদনের সময় ক্ষেত্রবিশেষে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দেশটিকে বিশেষ কর দিতে হতে পারে বা অনুমতি নিতে হয়; অর্থাৎ শুধু যে অর্থের বিশাল লাভ হয় তা নয়, কূটনৈতিক দিক দিয়েই জিআই পাওয়াটা একটি দেশকে সুবিধা দিতে পারে।
আর এ ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। সুইস ঘড়ি, বেলজিয়ামের আয়না, দার্জিলিংয়ের চা, পদ্মার ইলিশ এগুলো কয়েক শতাব্দী ধরে অন্যত্র উৎপাদিত হওয়া পণ্যের চেয়ে ভোক্তার কাছে অনেক বেশি প্রার্থিত। এর জন্য বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পারেন সেই অঞ্চলের উৎপাদকরা।
সমস্যা হচ্ছে, এই উৎসগুলো অনেক সময় নির্ণয় করা সহজ হয় না। কারণ অনেক সময় দেশভাগ হয়ে যায়, হয়তো একাধিক অঞ্চলজুড়ে একটি পণ্যের উৎস ছিল কিন্তু আধুনিক মানচিত্রে সেগুলো এখন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেশী দেশ। ফলে বৈশ্বিক আদালতগুলোতে বিচার হয়। এই যেমন ভারতের সঙ্গে বাসমতি চাল নিয়ে পাকিস্তানের চাপান-উতোর চলছে। সন্দেশ, জামদানি শাড়ি নিয়ে আমাদের সঙ্গে ভারতের।
আশ্চর্যজনকভাবে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিরা যথারীতি উদাসীন ও অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন। টাঙ্গাইল নামটাই যেখানে পরিষ্কার করে এই শাড়ির উৎস কোথায়, সেখানে পর্যন্ত তারা বিশ্ব আদালতে এ নিয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, শক্তিশালী প্রতিবেশী জল ঘোলা করছে।
এ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক সাইফুর রহমান ফেসবুকে উল্লেখ করেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিয়ে ভারত যেটা করল, সেটা আদতেই ন্যক্কারজনক। তারপরও কি আমাদের কানে পানি ঢুকেছে? মনে তো হয় না।
কারণ ঘটনা তো আজকের নয়। একটা প্রক্রিয়া শুরু করতেও তো সময় লাগে। সেটা যে আমাদের নীতিনির্ধারকদের জানা ছিল না, সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
গত মাসে বিষয়টি নজরে এলে আমি তাঁত বোর্ডের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এবং আমাকে নিয়ে যান তার রুমে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি, তিনি জানতেনই না এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি তখন তাঁত বোর্ডের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের আবেদনবিষয়ক কমিটির সদস্যদের ডাকেন। ওই কমিটির প্রধানসহ উপস্থিত তিনজনের বক্তব্যই ছিল অভিন্ন। তারা জানেন না ভারত টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই পেয়ে গেছে।’
টাঙ্গাইলের শাড়ি নিয়ে দেশের গর্বের কথা বাদই দিলাম, বিপুল বাণিজ্যিক ক্ষতি মাথায় নিয়েও তারা ব্যর্থ হচ্ছেন। এ এক অবিশ্বাস্য অক্ষমতা।
কিন্তু ফেসবুকে আমাদের প্রতিবাদ দুটি জরুরি জিনিস মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রথমত, সামনের দিনে আরও নানা রকম পণ্য নিয়ে এই লড়াই চলতে পারে। সেখানে আমাদের সতর্ক হওয়া খুব জরুরি। আমাদের আটঘাট বেঁধে নামতে হবে। জেলায় জেলায় নানা রকম বিখ্যাত মিষ্টি আছে, নানা রকম পোশাক পণ্য আছে, সেগুলোর ইতিহাস আমাদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এতে যে শুধু জিআইয়ের দাবি শক্ত হবে তা-ই নয়, আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যর সংরক্ষণ হবে।
কারা আবিষ্কার করেছিলেন নাটোরের কাঁচা গোল্লা? কোন পরিস্থিতিতে উদ্ভব হয় প্যাড়া সন্দেশের? টাঙ্গাইলের চমচমের ইতিহাস কী? রংপুরের শীতলপাটির পেছনে কাজ করে কোন ধরনের প্রজ্ঞা ও বিজ্ঞান? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক নানা রকম প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাব। ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া আমাদের ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে সাহায্য করবে।
দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে, আমাদের ঐতিহ্য এবং শক্তির পুনরুত্থান। ভারত আমাদের টাঙ্গাইলের শাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ায় আমরা ফুঁসে উঠছি, কিন্তু আমরা নিজেরা কি এই ঐতিহ্যের ব্যাপারে উদাসীন নই? তাঁতিদের খবর কি আমরা রাখি? কীভাবে এই দারুণ শিল্পটি বিশ^ময় ছড়িয়ে দিয়ে তাঁতিদের জীবনমান আরও উন্নত করা যায়, সেই চিন্তা কি আমরা করতে পারছি?
কেন আমাদের পাটশিল্প ধ্বংস হয়ে গেল? যেখানে সারা দুনিয়া এখন পরিবেশ সচেতন হয়ে পাটপণ্যের দিকে ঝুঁকছে, সেখানে কেন সোনালি আঁশ আমাদের জন্য অঢেল মুদ্রা উপার্জন করতে পারছে না?
এসব ভাবনার মাধ্যমে আমাদের একটা বড় উপলব্ধি হবে কৃষক, শ্রমিক আর মেহনতি মানুষের জীবনবোধ নিয়ে। জাতীয়তাবাদ অনেক সময় ধ্বংসাত্মক, সংকীর্ণ। কিন্তু এই যে ভাবনা যা আমার দেশের মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্ম করে, তা এক উদ্দীপক। এ ধরনের জাতীয়তাবাদ জনতাকে শোষকের বিরুদ্ধে এক জোট করবে।
আমাদের সেই অহম জেগে উঠুক।
