ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হলো আত্মশুদ্ধির প্রার্থনায়

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৪৪ এএম

তাবলিগ জামাতের একাংশের আয়োজনে ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের সমাপ্তি হয়েছে গতকাল রবিবার। তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মাওলানা বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়েরপন্থিরা এই পর্বে অংশ নেন। মুসলিম উম্মাহর সুদৃঢ় ঐক্য, দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, দেশের কল্যাণ কামনায় আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে গতকাল শেষ হয় ইজতেমার প্রথম পর্বের।

গতকাল আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের। তিনি আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় মোনাজাত করেন। মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়। এ সময় লাখো মুসল্লির ‘আমিন, আল্লহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে ইজতেমা ময়দান মুখরিত হয়ে ওঠে।

গতকাল বাদ ফজর থেকে হেদায়েতি বয়ান করেন পাকিস্তানি মাওলানা জিয়াউল হক। ইজতেমার পর যারা তাবলিগের সফরে আল্লাহর রাস্তায় বের হবেন, তাদের জন্য এ হেদায়েতি বয়ান করা হয়। এরপর নসিয়তমূলক বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেউলা। এরপর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সকাল ৯টায়। টানা ২২ মিনিটের মোনাজাতে বিশাল এই জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন মহান আল্লাহর দরবারে। কান্নায় বুক ভাসান তারা। প্রথম আট মিনিটব্যাপী মোনাজাতে মাওলানা জুবায়ের পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। পরে ১৪ মিনিট বাংলা ভাষায় মোনাজাত করেন। মোবাইল ফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। মাওলানা জুবায়েরের আবেগঘন মোনাজাতের সময় লাখ লাখ মুসল্লি কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে অশ্রুসিক্ত হয়ে যান। মোনাজাতের সময় আমিন আমিন ধ্বনিতে পুরো ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

গতকাল আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ। সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছান। সকাল ৮টার আগেই ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। রবিবার ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদের নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। আখেরি মোনাজাতে বিপুলসংখ্যক নারী অংশ নিয়েছেন।

বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে গতকাল আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গণশিক্ষামন্ত্রী সিদ্দিকউল্লাহ চৌধুরী, সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব আলম, জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

এদিকে আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরিবহনের ব্যবস্থা করা এবং লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করায় জনজট ও যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজট নিরসন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।

এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ৫১ দেশের ২ হাজার ৫৪০ জন বিদেশি মুসল্লি যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান থেকে সর্বাধিকসংখ্যক মুসল্লি ইজতেমায় যোগ দেন।

তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে বিভেদের কারণে ২০১৮ সাল থেকে বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে আলাদাভাবে। গত শুক্রবার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা শুরু হবে ৯ ফেব্রুয়ারি। সেই পর্বের নেতৃত্ব দেবেন ভারতের দিল্লি মারকাজের মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীরা। ১১ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত