বইমেলা বাংলা একাডেমির নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৯ এএম

দুই দশকে নামি প্রকাশনা সংস্থায় পরিণত হওয়া কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিন। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করলেও প্রথমে শুধু চাকরি-সহায়ক বই প্রকাশ করতেন। সৃজনশীল প্রকাশনায় তিনি যাত্রা শুরু করেন ২০০৪ সালে। গত ২০ বছরে কথাপ্রকাশ সৃজনশীল প্রকাশনাকে গুণেমানে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে, অন্তত এক দশক ধরে লেখকদের রয়্যালিটি, বইয়ের উৎপাদন খরচ কিংবা প্রচারের জন্য কথাপ্রকাশকে কোনো ভর্তুকি দিতে হয় না বলে দাবি করলেন জসিম উদ্দিন। আলাপে তিনি জানালেন, সৃজনশীল প্রকাশনায় এসেছিলেন নিজের মনের চাহিদা পূরণ করে পাঠককে মনের খোরাক দিতে, শুধু বৈষয়িক তিনি থাকতে চাননি।

কেমন বই প্রকাশের জন্য নির্বাচন করেন জানতে চাইলে স্পষ্টভাষী জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি যেমন বই পাঠকের জ্ঞানতৃষ্ণা বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করবে তেমন বই প্রকাশ করতে। আমরা গবেষণামূলক, চিন্তামূলক বই বেশি প্রকাশ করি। কথাসাহিত্যের সম্ভারও আমাদের আছে। তাছাড়া রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি-পরিবেশ, জীবনী-গ্রন্থ, শিশু-কিশোরদের বইসহ নানা বিষয়ে আমাদের প্রকাশনা সমৃদ্ধ। আমরা মনে করি গবেষণা বা প্রবন্ধ মানুষের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করবে, অন্যদিকে সাহিত্য তার মানসিক বিকাশে, কল্পনা মানস গড়তে সহায়তা করবে।

বইপ্রকাশ শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় জানিয়ে জসিম উদ্দিন বলেন, কথাপ্রকাশ সারা বছর বই প্রকাশ করে। বাংলাদেশে কয়েক দশক আগেও মেলার সময় ছাড়াও প্রায় সারা বছর বই প্রকাশিত হতো। কথাপ্রকাশ সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে। তিনি জানান, গত বছর থেকে প্রায় প্রতিমাসেই একাধিক বই প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।

জসিম উদ্দিন বলছিলেন, ‘মেলার আগে আগে প্রকাশনা শিল্পের সব ক্ষেত্রেই প্রচুর ব্যস্ততা থাকে। এ সময় সিরিয়াস বই করা ঠিক নয়। তাতে তাড়াহুড়ায় অনেক ভুল থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব ভাবনা থেকেও আমরা সারা বছর বই প্রকাশ করছি। সামনের বইমেলায়ও আমরা গবেষণামূলক ও প্রবন্ধের বইয়ের প্রতিই বেশি মনোযোগী। তবে কিছু ভালো কথাসাহিত্যের বইও প্রকাশের তালিকায় আছে। তাছাড়া কিশোরদের জন্যও আমরা বই প্রকাশ করে চলেছি। সব মিলিয়ে এবারের বইমেলায় আশা করি ৭০-এর বেশি নতুন বই প্রকাশিত হবে। তাছাড়া কিছু বই দ্বিতীয়-তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হচ্ছে। প্রকাশনার মানের দিকে তাকালেও দেখবেন আমাদের বই আনন্দ বা দেজ-এর চেয়ে ভালো প্রোডাকশন হবে।’

বইয়ের প্রচারণা নিয়ে কেমন কাজ করেন জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, কথাপ্রকাশ অফলাইন এবং অনলাইন দুই মাধ্যমেই বইয়ের প্রচারণার পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশের বিপণন কেন্দ্রগুলোতে আমাদের বই পাওয়া যায়। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে কথাপ্রকাশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকাশনীর বই বিপণনের ব্যবস্থা করেছি। বইমেলার বাইরে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের বইয়ের প্রচার করি। শিশু-কিশোরদের বই উপহার দিই। অনলাইনে আমাদের ওয়েবসাইট আছে। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজন করি। এতে প্রচুর পাঠকের সাড়া পাচ্ছি। আমরা নিয়মতিই বই নিয়ে অনুষ্ঠান করি, এই সেদিনই আশানুর রহমানের লেনিন উপন্যাসের মোড়ক উন্মোচন আয়োজনে আনু মুহম্মদের সভাপতিত্বে মশিউল আলম নূরুল কবির, মাসরুর আরেফিন, আফসানা বেগমদের উপস্থিতিতে আমরা জমকালো অনুষ্ঠান করেছি। ভালো বই নিয়ে আমরা সবসময় ভালো প্রচারণা করি।

সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনায় বড় সমস্যা কী জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, সৃজনশীল বইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভালো পান্ডুলিপি পাওয়া। সবাই খুব দ্রুত বই করতে চান। কিন্তু একটা পান্ডুলিপি প্রস্তুত করে ফেলে রাখতে হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো লেখকও লেখা ফেলে রাখতেন। তাতে পরবর্তী পাঠের সময় নিজের ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। সৃজনশীল রচনার ক্ষেত্রেও সিরিয়াসনেসের অভাব একটা বড় সমস্যা মনে হয়। ফিকশনও সম্পাদনা করার প্রয়োজন হয়। এটা আমরা অনেকে মানতে চাই না। তাছাড়া বিষয়ভিত্তিক পান্ডুলিপি পাওয়াও সমস্যা। লেখকদের রয়্যালিটি ও সম্মানী ঠিকমতো দেন কি না প্রসঙ্গে জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা পান্ডুলিপি পছন্দ হলে বেশিরভাগ লেখককে সম্মান করে একটা আগাম সম্মানী দিই, তারপর প্রথম বছরে রয়্যালিটিও তার হাতে তুলে দিই। দ্বিতীয় বছরে আমরা আগাম সম্মানীটা রয়্যালিটির সঙ্গে সমন্বয় করি। টাকা নিয়ে খারাপ বই করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কোনো বইয়ে মানের জায়গায় আমরা আপস করিনি, কোনো লেখকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমি মনে করি না কারোই টাকা প্রকাশককে দিয়ে বই করা উচিত। প্রকাশক হিসেবে লেখকদের কাছে চাওয়া জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন বলেন, লেখকরা আমাদের জাতির বিবেক, সংবেদনশীল মানুষ। সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর মানুষও তারা। তাদের লেখা পড়ে আমাদের প্রজন্ম মানবিক মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে। কিন্তু প্রকাশক হিসেবে লেখকের কাছে নিশ্চয়ই একটা ভালো বিষয়ভিত্তিক পান্ডুলিপি প্রত্যাশা করি। বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা চলছে, যুদ্ধ চলছে, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয় চলছে সেখানে মানুষের মানবিক হয়ে না ওঠার কোনো সুযোগ নেই। সমাজে মানুষের এমন মানসিক বিকাশ ঘটাতে লেখকরা অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তাদের লেখায় সেসব থাকুক। এটাই তাদের কাছে প্রকাশক হিসেবে চাওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত