১০০০ টাকায় ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা চেয়ারম্যানের!

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৫৬ এএম

পাবনার বেড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনা ১ হাজার টাকা জরিমানায় ধামাচাপা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। চাকলা ইউনিয়নে গত ৩১ জানুয়ারির ওই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় গত রবিবার থানায় মামলা করেন ধর্ষণের শিকার নারী। এরপর গ্রেপ্তার হয় মামলার প্রধান আসামি।

এলাকাবাসী জানায়, গত বছর আগস্টে বেড়া উপজেলার চাকলা আশ্রয়ণ কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসতি গড়েন ভূমিহীন দরিদ্র এক চা দোকানি। তবে তাদের সংসারে হঠাৎ এক ঝড়ে যেন নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা।

চা দোকানির অভিযোগ, গত ৩১ জানুয়ারি দুপুরে প্রতিবেশী শফিকুল ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করে তার স্ত্রীকে। বাড়িতে এসে তিনি দরজায় ধাক্কা দিলে পালিয়ে যায় শফিকুল। বিচারের আশায় স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ওইদিনই চাকলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদারের কাছে যান ভুক্তভোগী নারী। তবে মামলা বা আইনি সহযোগিতার পরিবর্তে সালিশ ডেকে শফিকুলকে মাত্র ১ হাজার টাকা জরিমানা, নাকে খত ও কান ধরে ওঠবস করিয়ে কথিত মীমাংসা করে দেন চেয়ারম্যান। তার এমন সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালে চেয়ারম্যান ভয়ভীতি দেখান বলে জানান ভুক্তভোগী নারী ও তার স্বামী।

ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জানান, গত রবিবার সকালে চাকলা ইউনিয়ন পরিষদে সালিশি বৈঠক বসান ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী। কয়েকজন ইউপি সদস্যসহ তার অনুসারীদের নিয়ে সালিশি বোর্ড গঠন করে কথিত বিচারকাজ পরিচালনা করেন ইউপি চেয়ারম্যান। ধর্ষককে জুতাপেটা, নাকে খত ও কান ধরে ওঠাবসা করার শাস্তি দেয় ওই সালিশি বোর্ড। একই সঙ্গে ধর্ষককে ১ হাজার টাকা জরিমানা করে ‘মীমাংসা’ করে দেন ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার। কিন্তু ভুক্তভোগী নারীর স্বামী ওই সিদ্ধান্ত না মেনে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে থানায় মামলা করার কথা জানান। তখন তাকে হুমকি দিয়ে মামলা করতে নিষেধ করেন চেয়ারম্যান।

ভুক্তভোগী নারীর স্বামী বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ইজ্জতের দাম ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করে রায় দেন ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার। রায় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি জানিয়েছি, এ রায় মানি না। আমি থানায় মামলা করব। তখন চেয়ারম্যান ধমক দিয়ে বলেন, “এত বড় সাহস তোর, আমার রায় মানিস না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে রটিয়ে দেব বউ দিয়ে দেহব্যবসা করিয়ে খাস”। এ ছাড়া গালাগালি ও নানারকম হুমকিও দেন চেয়ারম্যান। আমার স্ত্রীকে জোর করে ধর্ষণ করেছে শফিকুল। তার শাস্তি না দিয়ে উল্টো তার পক্ষ নিয়ে আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে। এরপরও আমি থানায় মামলা করেছি। পরে পুলিশ ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে।’

অভিযোগ রয়েছে, জমিজমা সংক্রান্তসহ বিভিন্ন ঝামেলার মীমাংসা করতে স্থানীয়রা ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদারের শরণাপন্ন হলে তিনি উভয়পক্ষকে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে কথিত সালিশ করে থাকেন। সালিশে স্বজনপ্রীতি ও টাকা নিয়ে অন্যায় রায় দেন তিনি। এ ছাড়া ধর্ষণের বিচার কোনো সালিশি বৈঠকে সম্পন্ন করার বিধান নেই জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদটির সাবেক সদস্য (মেম্বার) আহসান হাবিব বলেন, ‘ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া সালিশি রায়ে অভিযুক্তকে কায়া শাস্তি (শারীরিক শাস্তি) দেওয়ার এখতিয়ারও কারও নেই। এদিক থেকে ওই সালিশি কার্যক্রম সঠিক হয়নি।’

স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ হোসেন বলেন, ‘ধর্ষণের মতো অপরাধের মীমাংসা ১ হাজার টাকা জরিমানায়! এটি কোনোভাবেই সঠিক মীমাংসা হতে পারে না। এ ছাড়া এটি ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের জন্য খুবই দুঃখজনক।’

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে চাকলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস সরদার বলেন, ‘উভয়পক্ষের সম্মতিতে সালিশ করা হয়েছে। সালিশি কাগজপত্রে স্বাক্ষরও করেছেন তারা। এর বাইরে একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারাই এ বিষয়টি ভিন্নভাবে তুলে ধরছে।’

এ ব্যাপারে বেড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলে চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যদের পুলিশকে অবহিত করার দায়িত্ব রয়েছে। সালিশের এখতিয়ার কারও নেই। সেটি না করে অন্যায়ভাবে কেউ যদি কোনো সালিশ বা মীমাংসা করে থাকে সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত