জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পুরনো দানব আবার মাথাচাড়া দিয়েছে শিক্ষাঙ্গনটিতে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা এক নারীকে ধর্ষণ করেছেন, কা-টি করার সময় সেই নারীর স্বামীকে বেঁধে রেখেছেন এবং পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন। এক সময়ে ধর্ষণকা-ে জর্জরিত জাহাঙ্গীরনগর ফুঁসে উঠেছিল। গত শতাব্দীর শেষের দিকে ছাত্রদের বিপুল প্রতিবাদের মুখে এই অপসংস্কৃতি অনেকটাই দূরীভূত হয়েছিল। কিন্তু, ক্ষমতার প্রশ্রয়ে, জবাবদিহি না থাকায় আবার এর থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে বিশ্ববিদ্যালয়টির দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক রায়হান রাইন বলেন, এটা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটা একটা ঘটনামাত্র নয়, বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডের যে পরিসর তৈরি হয়েছে, এটা তার চূড়ান্ত রূপ বা বহিঃপ্রকাশ। অধ্যাপক রায়হানের কথার সঙ্গে একমত হয়ে যোগ করতে হয় যে, দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই এ ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন, প্রশাসন মিলে একধরনের ভয়ের ও দুর্নীতির রাজ কায়েম করেছে। হলে সাধারণ ছাত্রদের নিপীড়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রকম কাজে কমিশন বাণিজ্যসহ শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে প্রবল দলীয়করণ স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
এই সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। সরকারি দলের ছাত্রনেতা ও এদের ছত্রছায়ায় থাকাদের কোনো রকম বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, নানা রকম তদন্ত কমিটি হলেও তাদের রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। অপরাধীরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে, আরও শক্তিশালী হয়ে। এর ফলে, দিনকে দিন অপরাধ বেড়েই চলে। ধর্ষণের মতো অপরাধ এই সংস্কৃতিরই একটি প্রভাব। এই জঘন্য অপরাধটি করার আগে অপরাধীদের মনে বিচারের ভয় কাজ করে না। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনকে কলুষিত করলেও তারা নির্ভার থাকতে পারেন শাস্তি হবে না এই নিশ্চয়তায়। জাহাঙ্গীরনগরের সাম্প্রতিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। এমনকি শিক্ষকদের একটা অংশ এবং এক সময়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকারী প্রাক্তনরাও এই আন্দোলনে যুক্ত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দোষীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শিক্ষাঙ্গনে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সবসময়ই দেখি কর্র্তৃপক্ষ কিছু চটজলদি, অস্থায়ী সমাধান দেন। সমস্যার গোড়া উপড়ে না ফেলে, আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য কিছু নামকাওয়াস্তে লোকদেখানো ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং কর্র্তৃপক্ষের টালবাহানায় অপরাধীরা ছাড় পান।
তবে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুঁসে ওঠাটা একদিক দিয়ে ভীষণরকম আশা তৈরি করে। দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জাহাঙ্গীরনগর নিজের অঙ্গনের কলুষতা ও অন্যায় ধামাচাপা দিয়ে না রেখে প্রতিবাদ করছে। ভাবমূর্তি বা অন্য কোনো অজুহাত দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের থামানো যাচ্ছে না। এই ক্ষোভ, এই আত্মসম্মানবোধ ছড়িয়ে পড়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একটা দেশের গৌরব। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের খরচের বড় অংশই তো আসে জনগণের করের টাকায়। ফলে, দেশের মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি এদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অঙ্গনের সম্মান রাখতে না পারলে, আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখতে না পারলে গোটা দেশের জন্য সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবে এই আশা বাতুলতা।
ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ, যার পেছনে কাজ করে রাজনৈতিক উন্মত্ততা আর বেপরোয়া ভাব। দুর্ভাগ্যবশত, নানা কারণেই আমাদের দেশে ধর্ষকের বিচার হওয়ার হার বেশ কম। কিন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখি সুবর্ণচরে নির্বাচন-উত্তর, রাজনৈতিক বৈরিতার জেরে হওয়া এক ধর্ষণের অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত। পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনায়, অনেক দেরিতে হলেও একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় পাওয়াটা আন্দোলনকারীদের জন্য একটি ভালো সংবাদ। তবে, সুবর্ণচর হোক আর জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনা হোক, এদের ফলাফলটা পাওয়া গেছে বিপুল আলোচিত ঘটনা হওয়ার কারণেই। যতক্ষণ পর্যন্ত বিচারহীনতা বজায় থাকবে, সমস্যার মূল উৎপাটন না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত একটা দুইটা চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিপরীতে হাজার হাজার অন্যায় বিচারহীনভাবে থেকে যাবে।
