ফেব্রুয়ারি মাস নিয়ে আমাদের একটা আবেগ রয়েছে। ভাষার মাসে বইমেলা মানেই, অন্যরকম আয়োজনের দৃশ্যকল্প ভেসে ওঠে। বর্তমানে সরকার যাত্রা শুরু করেছে, স্মার্ট বাংলাদেশের পথে। কিন্তু হতাশ হই, যখন দেখি এই মেলাকে কেন্দ্র করে কোনো আধুনিকতাকেই গ্রহণ করা হয়নি। অথচ বর্তমানে কথা ছিল, মেলাকে ডিজিটালি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা। কিন্তু তা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? আমি যতটুকু বুঝি এর একমাত্র কারণ, মেলার নেতৃত্বে রয়েছে বাংলা একাডেমি। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, প্রকাশকদের হাতে বইমেলা ছেড়ে দিলে এর চেহারাই পাল্টে যাবে। কেন যাবে, তার কারণও রয়েছে। এর আগে বলা দরকার, বাংলা একাডেমি মেলা উপলক্ষে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়?
আসলে তারা ‘বাণিজ্য’ বিষয়টি মাথায় রেখে, এই মেলার আয়োজন করেন। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল না। কত স্টল দেওয়া যায়, কীভাবে রেস্টুরেন্ট দেওয়া যায় এসব তারা বিবেচনায় রাখেন। কিন্তু এটা তো সেই বিবেচনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে বলতে হয়, যারা যাচ্ছে, তাদেরকেই স্টল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তারা কী ধরনের বই বিক্রি করছেন, এটা তারা দেখেন না। অথচ যারা প্রকৃত প্রকাশক, স্টল তো কেবল তাদেরই পাওয়ার কথা। বইমেলা নিয়ে তাদের একটা কাগুজে নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু কস্মিনকালেও তা অনুসরণ করা হয় না। না হলে, বইমেলা উপলক্ষে এত বই কোত্থেকে আসে? তারা সম্ভবত জানেন না, কী ধরনের বই প্রকাশিত হচ্ছে। আসলে যার যা কাজ, তাই করা উচিত। বাংলা একাডেমির কাজ গবেষণা করা। বাঙালির লিখিত ইতিহাস খনন করা তাদের আসল দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? বইমেলা নিয়ে তারা যে সময় ব্যয় করে, এটা অযথাই। এমনটি কেন হবে?
সব জায়গাতেই বইমেলার আয়োজন করে প্রকাশকরা। অথচ আমরা কী করছি? এখন বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ প্রকাশকদের ওপর আস্থাহীন নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা বলা দুষ্কর। তবে প্রথম বিষয়টি আমি পরিষ্কার করতে পারি। সে জন্য তো প্রকাশকদের হাতে একবার মেলা আয়োজনের ভার অর্পণ করতে হবে? এমনি এমনি তাদের ওপর অবিশ্বাস বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে প্রকাশকদের দূরে ঠেলে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। এরই মধ্যে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমরা বইমেলায় অনেক আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছি। কিন্তু দূর থেকে সার্বিকভাবে তাকে পরিকল্পনা অনুযায়ী দৃশ্যমান করা সম্ভব নয়। যেহেতু বইমেলার নেতৃত্ব প্রকাশকদের হাতে নেই, তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন আয়োজন করা সম্ভব নয়। এই যে প্রতিবন্ধকতা, তা কেবলই সৃষ্টি হচ্ছে বাংলা একাডেমি এককভাবে এই মেলাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় বলে। কিন্তু প্রকাশকদের হাতে এই মেলা থাকলে, মান যাচাই-বাচাই করা সম্ভব হতো। এখন তো সেটি একেবারেই হচ্ছে না।
আসলে বাংলা একাডেমির হাতে বইমেলার নেতৃত্ব থাকলে অনেক সমস্যা। তারা নিজস্ব কাউন্সিল ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না। এর ফলে যা হয় তা হচ্ছে, একটি ভালো উদ্যোগও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কিন্তু এই সমস্যা প্রকাশকদের মধ্যে নেই। আমরা বরাবরই স্বাধীন। যে কারণে যে কোনো ভালো প্রস্তাব আমরা অনায়াসে কার্যকর করতে পারতাম। যা বাংলা একাডেমির পক্ষে সম্ভব নয়। মেলার অধিকাংশ স্টল নিজেদেরই। তারা তো মেলার ডায়াগ্রামই ঠিকমতো করতে পারেন না। বরাবরের মতো তারা তাদের সুবিধা-অসুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে বইমেলার নান্দনিকতাকেই হারিয়ে ফেলেছে। যে যাই বলুক, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে, বাংলা একাডেমি নিজেরাই নিজেদের আইন ভঙ্গ করছে। বইমেলায় বইবিক্রির একটা উদাহরণ দিলেই, বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তারা ৩০% কমিশনে বই বিক্রি করছেন। আর প্রকাশকরা করছেন, ২৫% কমিশনে। কেন? বাংলা একাডেমি মেলা উপলক্ষে যে শ্রম দিচ্ছে, তার জন্য তারা পারিশ্রমিক পাচ্ছে। সেটা নিয়ে কোনো কথা নেই। এটাই স্বাভাবিক। কারণ মাসব্যাপী তারা যে ধরনের কাজ করছে, তার জন্য সেটা দাবি করতেই পারে। এটা বড় কোনো কথা নয়। কিন্তু এখানে শ্রম এবং সময় দিতে হচ্ছে তাদের। ফলে গবেষণা, ভালো প্রকাশনা এবং অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তেমন কোনো সময় দিতে পারছে না। এই এক মাসের কারণে তাদের কাজ পিছিয়ে যায় ছয় মাস। যে কারণে এই বইমেলা প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া দরকার। বর্তমানে যে আঙ্গিকে মেলার আয়োজন হচ্ছে, প্রকাশকদের হাতে তা থাকলে অনেক ধরনের আধুনিকতা আসবে। অনেকে আবার এই বিষয়ে প্রশ্ন করেন। বলেন, প্রকাশকদের হাতে থাকলে কী ধরনের আধুনিকতা আসবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় মেলার ভার আগে প্রকাশকদের হাতে দেওয়া হোক, তারপর তারা দেখুক, কী ধরনের পরিবর্তন আসে? যদি আমরা ব্যর্থ হই, তাহলে বাংলা একাডেমি মেলার দায়িত্ব আবার তাদের কাছেই ফিরিয়ে নিক তাতে কোনো সমমস্যা নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই বইমেলা তো জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও আয়োজন করতে পারে? তাদের কাজ হচ্ছে, বইমেলা করা, বইকে প্রমোশন করা, সারা বাংলাদেশে বাংলা বইকে ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে এই বইমেলা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র খুব সহজেই করতে পারে। আবার আমর যৌথভাবেও করতে পারি। হ্যাঁ, বর্তমানে যে আঙ্গিকে বইমেলা হচ্ছে সেখানেও প্রকাশকরা রয়েছেন। কিন্তু সেটা নামেমাত্র। তাদের কোনো পরামর্শই শোনা হয় না। আমরা বারবার বলেছি স্টল বরাদ্দ দিতে হবে স্বচ্ছভাবে। কই, তা হচ্ছে? যারা ভালো বই প্রকাশ করে, একমাত্র তাদেরই তো স্টল পাওয়ার কথা। বইমেলা যদি প্রকাশকদের হাতে থাকত বর্তমান ডিজিটাল সময়কে কীভাবে যে ব্যবহার করা হতো, তা অনেকেই ধারণা করতে পারছেন না। প্রকাশক এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলিতভাবে বইমেলার আয়োজন করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। এটাই তাদের কাজ।
আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের পথে অগ্রসর হচ্ছি। বুকে হাত দিয়ে কেউ বলুক, বর্তমানে বইমেলায় তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার আমরা করতে পারছি কি না? এর উত্তর কী হবে সবারই জানা। বাংলা একাডেমির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু এই মেলার সঙ্গে তার যোগসূত্র কোথায় তা আমার মাথায় আসে না। একটি প্যাভেলিয়ন খুঁজতে হয় আমাদের। পাঠক জানে না, এটা কোথায়! এই কি ডিজিটালের নমুনা? মেলার বিভিন্ন পয়েন্টে যদি ইন্ডিকেটর থাকত, তাহলে কিন্তু বইপ্রেমিক ক্রেতার অনেকে ভোগান্তি কমে যায়। ডিজিটাল প্রচারের সুযোগও তারা নিতে পারে। কই হচ্ছে এসব? এর বাইরেও অনেক বিষয় রয়েছে। সমস্যাটা কিন্তু কারিগরি নয়, যারা এই পাথে হাঁটতে চান না, আসলে সমস্যা তাদের। তারপরও এই মেলা জমে ওঠে আপনা আপনিই। মূলত এখানে আসল ভূমিকা রাখছে মিডিয়া। সেই প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন পত্রিকা এবং ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণায় জমে ওঠে বইমেলা। এখানে বাংলা একাডেমির কোনো কৃতিত্ব নেই। সবকিছু বন্ধ করে দীর্ঘসময় বইমেলা উপলক্ষে ব্যস্ত থাকায় বাংলা একাডেমির ঠিক কী ধরনের সুবিধা হচ্ছে তা একটু খোঁজখবর নিলেই জানা যাবে। আমরা চাই বইমেলায় একজন পাঠক যেন নান্দনিকতার পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়া পান, তাদের ভোগান্তি কমে এবং মানসম্মত বইয়ের সঙ্গে পরিচিতি বাড়ে।
লেখকঃ প্রকাশক অনন্যা প্রকাশনী
