পশুর প্রতি খলিফা উমরের দয়া

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫০ এএম

হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। কিশোর বয়সেই কাঁধে বিভিন্ন দায়িত্বের ভার তুলে নিতে হয় তাকে। ফলে বেড়ে ওঠেন অভাব-অনটনের পরিবেশে। পিতা খাত্তাব ছিলেন কঠোর ও নীরস প্রকৃতির লোক। উট রাখালির কাজে মাঠে পাঠাতেন বালক উমরকে। পিতার এই কঠোর মানসিকতা তার অস্তিত্ব জুড়ে বেশ প্রভাব ফেলে। এটা তিনি মনেও রেখেছিলেন আজীবন। তিনি কেবল তার পিতার উটই চরাতেন না; বরং বনু মাখজুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত খালাদের উটও চরাতেন।

ইসলাম গ্রহণের আগে মক্কি জীবনে উমরের এই রাখালি পেশা তাকে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, বীরত্ব ও কঠোর স্বভাবের মতো গুণাবলি এনে দিয়েছে। জাহিলি যুগে তার গোটা জীবন কেবল ছাগল চরানোর কাজেই কাটেনি; বরং যৌবনের শুরুতেই তিনি শারীরিক বিভিন্ন ব্যায়াম ও যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। কুস্তি আর অশ্বারোহণেও সফলতা অর্জন করেন। কাব্যচর্চা থেকেও পিছিয়ে ছিলেন না। এসব বিষয়ে প্রাজ্ঞতা অর্জন করেন।

পশুদের প্রতিও উমরের বিশেষ খেয়াল ও দরদ ছিল। আর এই দয়া-মায়ার উৎস ছিল আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ গভীর ইমান। যে ইমান বান্দাকে আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দরদ ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে প্রলুব্ধ করে। আর তিনি আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন বিধায় তার হৃদয় সদা নরম হয়ে থাকত। ফলে তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ কাজ করত। তা ছাড়া ইসলামি শিক্ষার দর্শন থেকে তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, যেকোনো প্রাণীর ওপর অনুগ্রহ করা নিশ্চয় সওয়াবের কাজ। অনুরূপ তাদের ওপর বাড়াবাড়ি করা, সাধ্যের অধিক কাজ নেওয়া, যে উদ্দেশে তাদের সৃষ্টি করা হয়নি, সেই উদ্দেশে তাদের ব্যবহার করা ইসলামি শরিয়ত অনুমোদন করে না। এই দরদ ও চিন্তার ফলেই তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমি ওই খচ্চরেরও জিম্মাদার, যে রাস্তা খারাপ হওয়ায় ইরাকের কোনো গর্তে পড়ে গেছে।’ এ পর্যায়ে ফারুকি চরিত্রের চিত্তাকর্ষক কিছু ঘটনা আলোকপাত করা যেতে পারে, যা মানবেতিহাসে সোনার কালিতে লিখে রাখার মতো। হজরত মুসায়্যিব বিন দারিম থেকে বর্ণিত, আমি উমরকে দেখি তিনি উটের এক চালককে চাবুক দেখিয়ে শাসাচ্ছেন আর বলছেন, তুমি উটের পিঠে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছ। এই উটের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তার সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় কর।

আহনাফ ইবনে কায়েস বলেন, আমরা উমরের কাছে বিশাল এক বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে এলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোথায় অবস্থান করছ? আমি বললাম, অমুক জায়গায়। তখন তিনি আমার সঙ্গে আমাদের সওয়ারির উট পর্যন্ত চলে আসেন। এরপর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলেন, তোমরা কি এই সওয়ারিগুলোর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর না? তোমাদের কি জানা নেই এগুলোর ওপরও তোমাদের হক আছে? এগুলোকে ঘাস খেতে চারণভূমিতে ছেড়ে দাওনি কেন?

একবার উমর (রা.) একটা উটের মধ্যে অসহায়ত্ব ও রোগের লক্ষণ দেখতে পেয়ে সেটার কাছে যান। কাছে গিয়ে তার গলায় হাত রেখে দেখতে লাগলেন এবং নিজেকে বলতে লাগলেন, আমার ভয় হচ্ছে তোমার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হয় কি না।

এই হচ্ছে ফারুকি জীবনের অবিস্মরণীয় কিছু চিত্র, যা পশুদের সঙ্গে তার নিখাদ গভীর দয়ামায়া ও যত্নের প্রতি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। বর্তমান সভ্যতার যুগের মোহগ্রস্ত যুবকেরা যদি ফারুকি জীবন চরিত অধ্যয়ন করত এবং তার ইসলামি জীবনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখত, তবে তারা জানতে পারত মানবরচিত যেসব আইন সমাজের অধিকার রক্ষার অনুকূলে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তা শুরু থেকে ইসলামই সুবিন্যস্ত করে রেখেছে।

নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা এবং আল্লাহভীতির কারণেই তিনি এসব বিষয়ে এতটা মনোযোগী ছিলেন। বস্তুত আল্লাহর ভয় হচ্ছে ইমানদারদের জন্য অলংকারস্বরূপ। এটাই হচ্ছে সব নেক আমলের ভিত্তি, হেদায়েতের মূল এবং কল্যাণের মিনার। হজরত উমরের আল্লাহভীতির গুণ-বৈশিষ্ট্য ছাড়িয়ে গিয়েছিল অন্যসব বৈশিষ্ট্যকে। তিনি নিজেকে সবসময় আল্লাহর সামনে জবাবদিহিরত মনে করতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত