আসামে বসবাসরত বাঙালিদের সংকট বহুকালের। মওলানা ভাসানী আসামে যান ১৯০৪ সালে। ১৯২৪ সালে তিনি সেখানে স্থায়ী হয়েছিলেন। ১৯২৯ থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি আসামের অধিকার-বঞ্চিত বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি যুক্ত থেকেছেন। ভাসানীর মতো নেতা আসাম আর দ্বিতীয়টি পায়নি বলেই অনেকের ধারণা। আসামের বাঙালিরা কৃষিকাজে অংশ নিতে পারলেও কৃষিজমির মালিকানা তাদের ছিল না। জমিদার-ভূস্বামীরা যখন ইচ্ছা তখন ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে পারত। মওলানা ভাসানী আসামের ভাসান চরে আসাম-বাংলা প্রজা-সম্মেলনের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে হলেও ভূমিতে সাধারণ ভূমিচাষিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। ১৯২০ সালে আসাম সরকারের প্রবর্তিত লাইন প্রথা’র বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী লাইন প্রথা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। আসামের বঞ্চিত বাঙালিদের সংগঠিত করে গঠন করেন ‘আসাম চাষি মজুর সমিতি’। এর মাধ্যমে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালে আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে মওলানা ভাসানী লাইন প্রথা বিরোধী একটি বিল উত্থাপন করেন। লাইন প্রথার প্রশ্নে কংগ্রেস সরকারের নির্লিপ্ত ভূমিকার তিনি কঠোর সমালোচনা করেন।
১৯৪২ সালের ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা আসাম প্রজা সম্মেলন থেকে কঠোরভাবে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ৩১ মার্চের মধ্যে ‘লাইন প্রথা’ বিলুপ্ত করা না হলে এপ্রিল মাস থেকে তিনি আইন-অমান্য আন্দোলন শুরু করবেন। বিপদ বুঝে সরকার এক বছরের জন্য মওলানা ভাসানীর সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু সেভাবে তাকে দমন করা সম্ভব হয়নি। মওলানা ভাসানীর চাপে ১৯৪৩ সালের ২৪ আগস্ট ‘লাইন প্রথা’কে কিছুটা শিথিল করে সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়। পরের বছর মার্চে ব্যবস্থাপক সভার বাজেট অধিবেশনে তিনি আসামের অতিরিক্ত জমি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী, হিন্দু ভূমিহীন কৃষক এবং অভিবাসী বাঙালিদের মধ্যে বিলি-বণ্টনের দাবি জানান। এরপর ১৯৪৪-৪৫ সালে অহোম জাতীয় মহাসভার আহ্বানে আসামে ‘বাঙালি খেদা’ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। অবশ্য অনেক আগে থেকেই অসমীয়রা আসাম রাজ্য থেকে বাঙালিদের বিতাড়নের নানা চেষ্টা চালাচ্ছিল। ‘বাঙালি খেদা’ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী মঙ্গলদই, বরপেটা, গৌহাটিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি উচ্ছেদ ও রাজ্য সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অভিবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করে ‘বাঙালি খেদা’ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। আসাম থেকে বাঙালিদের বিতাড়নের ঘটনা তাই নতুন নয়, বহুকাল ধরেই অসমীয়রা বাঙালি খেদাও-এর জন্য অহিংস-সহিংস উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে এসেছে।
১৯৮৫ সালে কংগ্রেস সরকারের শাসনামলে স্বাক্ষরিত আসাম চুক্তিতেই আসামে (এনআরসি) জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির কথা উল্লেখ ছিল। চুক্তি মতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ রাত ১২টার আগে যারা রাজ্যে বসবাসের প্রমাণ দিতে পারবেন তাদেরই কেবল ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। পরবর্তী সময়ে অসমীয়দের এই দাবির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণেই বিজেপি’র পক্ষে আসামে জনরায়ে রাজ্য-সরকার গঠন করা সহজ হয়েছিল। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত চুক্তির ওই ধারাকে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। ওদিকে কেন্দ্রের শাসক দল হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সারা ভারতে নাগরিকপঞ্জি তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। দলটির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘গোটা দেশকেই আমরা অনুপ্রবেশমুক্ত করব’। আরও বলেছেন, ‘শুধু আসাম নয়, দেশের কোনো রাজ্যে একজন বিদেশিরও স্থান হবে না। সব জায়গা থেকে অবৈধ অভিবাসীদের উচ্ছেদ করা হবে’। কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব বিলে সংশোধন আনতে বদ্ধপরিকর। তারা বলছে, এবং চাইছেও, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে। অপর দিকে তথাকথিত মুসলিম অবৈধ অভিবাসীদের ভারত থেকে বিতাড়নে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ৩১ জুন ২০১৮ সালে আসামের নাগরিকদের যে তালিকা তৈরি করা হয় তাতে ৪০ লাখ বাংলাভাষীর নাম ছিল না। এদের বেশির ভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। চূড়ান্ত এনআরসি তালিকায় আসামে বসবাসকারী ১৯ লাখ বাংলাভাষীর নাম নেই। এই ১৯ লাখের মধ্যে ১২ লাখই হিন্দু, বাকিরা মুসলমান। চূড়ান্ত তালিকা তাই বিজেপি’র জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়নে খোদ বিজেপিতেই এখন অনীহা দেখা দিয়েছে। দলটির ভেতরেই বিভাজন ক্রমাগত প্রকাশ পাচ্ছে।
অমিত শাহ-সহ বিজেপি নেতারা বিগত লোকসভার বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, ‘অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে’। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রাক্কালে আসামের গুয়াহাটি সফরে অমিত শাহ কৌশলগত কারণে কিন্তু একবারও বলেননি অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্বাক্ষরকালে যাতে কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি না হয় অভিপ্রায়ে তিনি কৌশলী অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এবং পরে ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা তিনি বারবারই বলেছেন। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে একাধিকবার দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে জানিয়েছে, আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সান্ত¡নার বাণী শোনাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করও ঢাকা সফরে এসে বলে গেছেন, ‘বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই’। বিজেপির অনেক নেতা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ না করে বরং বলেছেন, ‘ওটা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বক্তব্য। দল ও সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট যে, ভারতের সব রাজ্যে এনআরসি’র মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসী মুসলিম সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে’।
১২ আগস্ট ২০১৯ কলকাতায় এক জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা বিপদ, নাকি বিপদ নয়? ভারত জুড়ে সন্ত্রাসের মূলেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। বোমা ফাটিয়ে ভারতের শান্তি-স্থিতি বিনাশে তৎপর এসব অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোই উচিত।’ অমিত শাহ বারংবার বলে চলেছেন, ‘কোনো হিন্দুকে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হবে না’। স্পষ্ট ভাবেই বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা সব হিন্দুকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এর বাইরে যারা আছে অর্থাৎ মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক তাদের অবশ্যই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। আসামসহ ভারত রাষ্ট্র থেকে কিন্তু হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে না’। বিজেপি সরকারের এই ঘোষণায় আসাম রাজ্য থেকে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলনকারী অসমীয়রা ভীষণ রুষ্ট; তারা বলছে, বিজেপি’র এই বক্তব্য আসাম চুক্তির চরম লঙ্ঘন। তাদের কাছে সব বাঙালিই বহিরাগত, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের অভিবাসীদের সঙ্গে কট্টর অবস্থানের সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের যথেষ্ট মিল রয়েছে। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প এবং মোদি সরকারের আস্ফালন ইতিহাসে কালো ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। ট্রাম্পের পূর্বপুরুষরা যেমন ইউরোপ থেকে আগত তেমনি বহিরাগত অসমীয়রাও বাইরে থেকেই এসেছে। আর এটা সত্য যে, মানব সভ্যতার বিকাশ অভিবাসীদের আগমনের মাধ্যমেই ঘটেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী তৎপরতা যে ভারতবর্ষের মানুষদের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না, সেটা নিশ্চিত।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
