হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সভাপতি এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম। তিনি সভাপতি হিসেবে টানা তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনায় নানা ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরবর্তী সময়ে স্থবির হয়ে যাওয়া এ খাতকে গতিশীল রাখতে তার ভূমিকা সবার নজর কাড়ে। সম্প্রতি হজের ব্যয় বৃদ্ধি ও হজ নিবন্ধনে কোটা অপূর্ণ থাকাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : চার দফা সময় বাড়িয়েও পূরণ হলো না হজ কোটা, এর কারণ কী?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : প্রথমত হজযাত্রী নিবন্ধন চলমান থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ছিল এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেকেই ব্যস্ত ও হজযাত্রার বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন। হজযাত্রা যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের বিষয় তাই নির্বাচনের পরেও সম্মানিত হজযাত্রীরা চূড়ান্ত নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তাছাড়া করোনা মহামারীর সময় ওমরাহ পালনের জন্য প্রথমেই কাবার দরজা খুলে দেওয়া হলো, তখন হজ পালনের সুযোগ না থাকার কারণে অনেকেই ওমরাহ পালন শুরু করল। কিছু কিছু মানুষের মধ্যে এ ধারণাও তৈরি হলো ওমরাহ পালন করলেই হজের ফরজ আদায় হয়ে যাবে। ওমরাহ করতে গেলে পবিত্র কাবা ঘরের তাওয়াফ ও রাসুল পাক (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করা যায়। মূলত ওমরাহ পালন করলে হজের ফরজ আদায় হবে না। এটিও হজযাত্রী কম হওয়ার একটি বড় কারণ।
দেশ রূপান্তর : গতবারের তুলনায় এবার হজের কোটা অনেক খালি, হজ কোটা অপূর্ণ থাকার প্রভাব কী হতে পারে?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : হজযাত্রী কমার কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে না। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যার ভিত্তিতে সৌদি সরকার ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রীর কোটা প্রদান করেছিল। প্রাপ্ত কোটা পূর্ণ করতে না পারলে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত প্রদান করলে আর কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের অব্যবহৃত কোটা সৌদি অন্য দেশকে প্রদানের সুযোগ পাবে। এ বছর সৌদি সরকারের নিয়মানুসারে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অব্যবহৃত কোটা সৌদি সরকারকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তাই কোটা পূর্ণ না হওয়া বা ফেরত দেওয়াতে ভবিষ্যতে পূর্ণ কোটা পেতে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া বিভিন্ন বছর পৃথিবীর অনেক দেশ কোটা পূর্ণ করতে পারে না। ২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশও কোটা পূর্ণ করতে পারেনি।
দেশ রূপান্তর : হজের ব্যয় বেড়েছে, কোন কোন খাতে ব্যয় বেড়েছে?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : হজের ব্যয় বাড়েনি বরং কমেছে। ২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালে হজের ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। হজের মূল কার্যক্রম ও বেশিরভাগ খরচ সৌদি আরবে করতে হয় এবং মূলত সমস্ত খরচ ডলারে করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যদি হজের খরচ ৫ হাজার ডলার হয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয় মুদ্রায় বা টাকায় ২০১৯ সালে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা দিয়ে হজের খরচ হয়ে যেত, যা ২০২৪ সালে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ হওয়ার কথা। অর্থাৎ ডলারে হজের খরচ আগের মতোই আছে, কিন্তু বৈশ্বিক কারণে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে স্থানীয় মুদ্রায় হজের খরচ বেশি পরিশোধ করতে হয়।
দেশ রূপান্তর : এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হজ প্যাকেজের ব্যয় বেড়েছে, এটা কমানোর কি কোনোই উপায় নেই?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : দুভাবে হজের ব্যয় কমানো যায় ১. ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো মসজিদে হারাম থেকে ৪/৫ কিলোমিটার দূরে হজযাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হলে, আবাসন খরচের খাত থেকে হজের ব্যয় কিছু কমানো সম্ভব। তাছাড়া বিমানভাড়া কমিয়েও হজের খরচ কিছুটা কমানো যায়। তবে বাংলাদেশের হজযাত্রীরা তুলনামূলক বয়স্ক ও দুর্বল হওয়ার কারণে দূরবর্তী আবাসনে থাকতে চান না। ফলে বেশি দাম দিয়েই হারাম শরিফের কাছাকাছি হজযাত্রীদের আবাসন ব্যবস্থা করার কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাসস্থান খাতে খরচ কমানো সম্ভব হয় না। আমার জানামতে উল্লিখিত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের হজ প্যাকেজের ব্যয় বেশি না।
দেশ রূপান্তর : নির্ধারিত এয়ারলাইনসই কেন হজযাত্রী পরিবহন করবে?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : হজ ব্যবস্থাপনা একটি দ্বিরাষ্ট্রিক কার্যক্রম। ২০১১ সাল পর্যন্ত যেকোনো এয়ারলাইনসে হজযাত্রী গমন করতে পারত। কিন্তু সৌদি সরকার ২০১২ সাল থেকে নতুন আইন করেছে, যাতে মাত্র দুটি রাষ্ট্রের এয়ারলাইনস হজযাত্রী প্রেরণের শর্তারোপ রয়েছে। এই শর্ত ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের অন্যান্য এয়ারলাইনস বর্তমান সৌদি নিয়মে বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রী পরিবহন করতে পারবে।
আমাদের দাবি, হজযাত্রী পরিবহনে সব এয়ারলাইনস উন্মুক্ত করা হোক এবং টেন্ডারের মাধ্যমে উড়োজাহাজ ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। এতে করে হজযাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধি ও হজ টিকিটের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
দেশ রূপান্তর : সৌদি আরব হজনীতিতে অনেক পরিবর্তন আনছে। ফলে নানা শঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : আপনি যথার্থ বলেছেন, সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। হজ এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে এজেন্সি-প্রতি হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি সরকার। একই এজেন্সিতে বেশি সংখ্যক হজযাত্রী গমন করলে হজযাত্রীদের সরাসরি সেবাপ্রাপ্তিতে বিঘ্ন ঘটবে। অর্থাৎ একই এজেন্সি যদি অনেক বেশি হাজি নিয়ে যায় তাহলে হজযাত্রীদের সেবার মান কমবে এবং বাংলাদেশের বয়োবৃদ্ধ হজযাত্রীরা সমস্যার মুখোমুখি হবেন। আমরা সৌদি সরকারকে এ বিষয়ে বুঝিয়ে এজেন্সির সংখ্যা না কমানোর অনুরোধ করলে সৌদি সরকার তা আপাতত রহিত করেছে। তাছাড়া হজযাত্রীদের জন্য মিনার তাঁবু ব্যবস্থাপনা, আবাসন নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ থেকে হজের খরচের বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন রকম নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সৌদি সরকার হজযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও যাত্রার কথা চিন্তা করে হজ ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাচ্ছে। সারা বিশ্বের হজযাত্রীদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সৌদি সরকার নতুন নতুন পদ্ধতি ও উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তবে এর কোনো কোনোটি বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল হজ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে কিছুটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
সৌদি সরকার কর্র্তৃক প্রণীত নতুন নীতিমালা ও পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে আমাদের কর্র্তৃপক্ষ ভালোভাবে ওয়াকিবহাল হয়ে, হজ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে সৌদি সরকার অনুসৃত নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের হজযাত্রীদের কল্যাণে পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় হজ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর নির্বাচনে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ভোটারদের জন্য কোনো আশ্বাস?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় অনেক বিশৃঙ্খলা ছিল, এ জন্য অনেকেই হাবের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করত। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হজ ব্যবস্থাপনায় হাবের ভূমিকা দেশ-বিদেশে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। হজযাত্রীদের ট্রলিব্যাগ, রিপ্লেসম্যান্ট ও কোটা বাণিজ্যসহ হজ ব্যবস্থাপনায় সব রকমের অনিয়ম দূর করার সর্বকঠিন কাজটি করা সম্ভব হয়েছে। সব ধরনের লোভের ঊর্ধ্বে থেকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমি হজযাত্রীদের খাদেম হিসেবে হাবের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছি। হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকলেই আল্লাহর মেহমান হজযাত্রী ও হজ এজেন্সি উভয়েরই কল্যাণ হয়। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহর মেহমান হজযাত্রীরা। আমার দায়িত্ব পালনে যদি হজযাত্রীদের ন্যূনতম কোনো কষ্ট লাঘব হয়, তারা প্রতারিত না হন বরং হজ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল হয়, তাহলে এটাই আমার সার্থকতা। এজেন্সির প্রতি আমার বক্তব্য, যদি হজ ব্যবস্থাপনার কল্যাণে কাজ করে থাকি, তাহলে আমাকে সমর্থন করা আপনার নৈতিক দায়িত্ব। আর যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বা হজ ব্যবস্থাপনায় অকল্যাণকর কোনো কাজ করে থাকি, তাহলে আমার বিরোধিতা করা বা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাও আপনার নৈতিক দায়িত্ব। হজ ব্যবস্থাপনায় যে সব এজেন্সি ভালো কাজ করবে এবং হজযাত্রীদের প্যাকেজ অনুসারে প্রকৃত সেবা প্রদান করে হজযাত্রীদের কল্যাণে আত্মনিবেদন করে ব্যবসা পরিচালনা করবে, সে সব এজেন্সির জন্য আমার সহযোগিতা নিরলসভাবে সততার সঙ্গে অব্যাহত থাকবে।
দেশ রূপান্তর : গণমাধ্যমগুলো হজ ব্যবস্থাপনায় কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
এম. শাহাদাত হোসাইন তসলিম : হজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ও সুশৃঙ্খল হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গণমাধ্যম একদিকে হজ ব্যবস্থাপনার বর্তমান উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার ভালো দিকগুলো তুলে ধরে এবং অপরদিকে হজযাত্রীদের কষ্ট ও অব্যবস্থাপনা বিষয়গুলো আমাদের ধরিয়ে দেওয়ার কারণেই আমরা হজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও হজযাত্রীদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছি। তাছাড়া হজ ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যরোধ ও হজযাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।
