২০ নম্বর জার্সি বেছে নেওয়ার কারণ কী? জবাবে মিলল একটা লাজুক হাসি। ওই টুকুই। কারণ ব্যাখ্যার পথেই হাঁটলেন না। রাকিব হোসেন এমনই। মিডিয়ার সামনে ভীষণ লাজুক। ঠিক মাঠের উল্টো। ২০ নম্বরের হেতুটা বুঝতে অবশ্য বাকি থাকেনি। দুনিয়া জুড়ে অনেক বড় তারকা এই জার্সিতে দ্যুতি ছড়িয়েছেন, এখনো ছড়াচ্ছেন। সাবেক ম্যাচইউ তারকা ওলে গানার সোলসকায়ের, আর্জেন্টিনার গঞ্জালো হিগুইয়েন, ডাচ ফরোয়ার্ড রবিন ফন পার্সি, হালের রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিউস জুনিয়র, ফরাসি ফরোয়ার্ড কিংসলে কোম্যানের জার্সি নম্বর ২০। এরা নিজ নিজ দেশ ও দলের একেকজন দুর্ধর্ষ ফরোয়ার্ড। রাকিবও হতে চান তেমনই ফরোয়ার্ড। বয়স চব্বিশ। তাকে এখন আর তথাকথিত ‘উনিশ-বিশের’ তালিকায় রাখার সুযোগ নেই। চলতি মৌসুমে বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে বারবার বিস্ফোরিত হয়ে নিজের জাত চেনাচ্ছেন ভিনদেশিদের ভিড়ে।
‘উনিশ-বিশের’ বিষয়টা একটু খোলাসা করি। দেশের ফুটবল সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটা কথা বেশ প্রচলিত। স্থানীয় ফুটবলারদের মান নিয়ে কথা উঠলেই বলতে শোনা যায়, ‘এরা সবাই উনিশ-বিশ।’ জাতীয় দলের ভেতর আর বাইরের ফারাকটা বোঝাতে বলা হয় এই কথা। এই উনিশ-বিশের মাঝে রাকিবকে রাখতে হবে আলাদা করে। ২০ নম্বর জার্সি পরে খেলা চব্বিশের রাকিব নিজে যেমন বদলে গেছেন, তার ছোঁয়ায় বদলে গেছে জাতীয় দল। পঞ্চম লিগ শিরোপার দিকে ছুটতে থাকা কিংসেও রাখছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। আর এ সব কিছুতে রাকিব বদল এনেছেন স্থানীয়দের নিয়ে প্রচলিত ভাবনায়-বলায়।
চলতি লিগে চারটি গোল করে, দুটি গোল করিয়ে কী এমন করে ফেলেছেন রাকিব যে তার স্তুতি শুরু করে দিতে হবে? অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবেন। তবে একটু গভীরে গেলে প্রশ্নকর্তারাও একমত হবেন যে এই রাকিব অন্য ধাতে গড়া।
সেটা জানতে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে। বরিশাল সদরের চড়বাড়িয়ায় ছেলে রাকিব। কৈশোরে ফুটবলে মজেছিলেন। তবে বাবা-মা চাইতেন পড়ালেখা করে রাকিব প্রতিষ্ঠিত হোক, হাল ধরুক পরিবারের। বাবা-মার চাওয়াটা তাদের মতো করে পূরণ করতে পারেননি। তবে হালটা ঠিকই ধরেছেন; সেটা ফুটবল খেলে।
ছোট্ট রাকিবের পড়ার টেবিলে মন ছিল না। বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন এগিয়ে নিতে পাশে পেয়েছিলেন পাড়ার দুই বড় ভাইকে, ‘রাকিব ভাই ও সোহেল ভাই ফুটবলার হতে আমাকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন। তাদের অবদান ভুলব না কখনই।’ বরিশালের গন্ডি পেরিয়ে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান রাজধানীতে। পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ পেরিয়ে এক সময় নাম লিখান বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। দ্বিতীয় পেশাদার লিগে পুলিশ দলের হয়ে কিছুদিন খেলেই নজর কাড়েন অভিজ্ঞ কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানীর। বসুন্ধরা কিংসের সহকারী কোচ সে সময় ছিলেন ভিক্টোরিয়া ক্লাবের দায়িত্বে। পরের মৌসুমে জিলানী রাকিবকে নিয়ে আসেন নিজের দলে। পরের মৌসুমে জিলানীর হাত ধরেই তিনি শীর্ষ লিগে পা রাখেন রহমতগঞ্জ দলে। সেখানে খেলাবস্থায় বসুন্ধরা কিংসের রাডারে চলে এসেছিলেন রাকিব। তবে শীর্ষ দলে খেলার সেই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে আরও পরিণত করে তুলতে, ‘রহমতগঞ্জে থাকাবস্থায় কিংস আমাকে নিতে চেয়েছিল। শীর্ষ দলে খেলার স্বপ্ন সবার থাকে। আমারও ছিল। তবে তখন চিন্তা করেছি, কিংসে আসলে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাব না। তাই তখন না করে দিই। এরপর দুই মৌসুম চট্টগ্রাম আবাহনী, আর এক মৌসুম ঢাকা আবাহনীতে খেলে গত মৌসুমে কিংসে যোগ দিই। আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, যদি নিয়মিত খেলার সুযোগ পাই, পারফর্ম করতে পারি, এক সময় ভালো সুযোগ আসবেই।’ কিংসে আসার পর অবশ্য কঠিন পথ পেরুতে হয়েছে এবং হচ্ছেও। রাকিব বলেন, ‘শীর্ষ দলে এলেই তো হলো না। এখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেটা আমি মনে করি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে আক্রমণভাগে সব উঁচুমানের বিদেশি। তাছাড়া আমার পজিশনে জাতীয় দলের পাঁচ-সাতজন খেলোয়াড় আছে। তাই প্রতিনিয়ত আমাকে নিজের সঙ্গে এবং সতীর্থদের সঙ্গে লড়াই করতে হয় একাদশে জায়গা পেতে। তবে আমি আমার কোচিং স্টাফ ও সতীর্থদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়তই শিখছি।’
রবসন, মিগেল, ডরিয়েলটনদের মতো রাকিবও কিংসের আক্রমণভাগে এ মুহূর্তে অটোমেটিক চয়েজ। স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে গোল দিয়ে মৌসুম শুরু। লিগে প্রথম তিন ম্যাচে টানা গোল করেছেন। এরপর দুই ম্যাচ গোল পাননি। ফের পেয়েছেন সর্বশেষ রাউন্ডে। চার গোলই চোখ ধাঁধানো। এছাড়া সতীর্থ ডরিয়েলটনকে দিয়ে দুটি করিয়েছেন। অথচ গত মৌসুমেও গোল করাটা তার জন্য সহজ ছিল না। সহজ হয়েছে আসলে জাতীয় দলে খেলে, ‘গত বছর সাফ থেকে আমাকে মূলত ফলস স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে হচ্ছে। কিছু গোলও করেছি। তাতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের সেই আত্মবিশ্বাসটা ক্লাবের হয়ে এখন কাজে দিচ্ছে।’ এক্ষেত্রে কোচ অস্কার ব্রুজোন ও দুই সতীর্থ রবিনহো ও মিগেলের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই রাকিবের, ‘কোচ সবসময় একটা কথাই বলেছেন, তুমি অনেক দ্রুতগতির। তোমার সবকিছুই ভালো। শুধু অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে একটু বেশি তাড়াহুড়ো করো। এই জায়গাটায় উন্নতি করলে দেখবে গোল পাবে। দলের অনুশীলন শেষে তাই এ জায়গাটায় নিয়মিত কাজ করছি। তাতেই হয়তো ফল পাচ্ছি। তাছাড়া আগে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারতাম না। এখন সেটা একটু একটু পরি (হাসি)।’
পারফরম্যান্স দিয়েই আলোকিত হচ্ছেন রাকিব। সেটা পারছেন একাগ্রতা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে। তবে নিজেকে কখনই অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রাখতে চান না রাকিব, ‘আমি কখনই নিজের মূল্যায়ন করি না। এটা সমর্থকরা করবেন। তাছাড়া আমি কখনই নিজেকে সেরা ভাবি না। তারকা ভাবার তো প্রশ্নই আসে না। শুধু জানি যতক্ষণ পারফর্ম করব, ততক্ষণ মানুষ প্রশংসা করবে। পারফর্ম করতে না পারলে কেউ মনে রাখবে না।’ এরপর যোগ করেন, ‘ফুটবলারদের স্বল্প ক্যারিয়ার। আলফাজ ভাই, কাঞ্চন ভাই, আরমান ভাইদের কথা শুনেছি। এদের কথা কিন্তু এখনো মানুষ বলে। একদিন তো খেলা ছাড়তে হবে, তখন যাতে আমার নামটা তাদের মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরে সে রকম কিছুই করতে চাই।’
দেশের হয়ে সাফ শিরোপা জয়, ভালো সুযোগ পেলে বিদেশের লিগে খেলার স্বপ্নগুলো আর দশজনের মতো রাকিবেরও আছে। তবে সবচেয়ে বেশি আছে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে গোলের তৃষ্ণা। দুইয়ের যোগফলে এই রাকিব ভীষণ ভয়ংকর।
গত বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অপ্রত্যাশিত ভালো পারফরম্যান্সের পর বাংলাদেশ দলের প্রশংসা করতে গিয়ে রাকিবকে নিয়ে দেশের ফুটবলের তর্কাতীত সেরা ফুটবলার, বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ‘আমরা একজন সুপারস্টার পেয়েছি, রাকিব। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড সে। যদি সে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে পারে, তবে সে আরও ভালো হতে পারবে। দেশের সর্বকালের সেরা ফরোয়ার্ড হওয়ার সক্ষমতা তার আছে।’
রাকিব সেই পথেই আছেন। এটা ধরে রাখলে একদিন হয়তো সেরার বিতর্কে সালাউদ্দিনের সঙ্গেই উচ্চারিত হবে তার নাম। তখন নিশ্চয় সালাউদ্দিনই সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন।
