চিকিৎসার নামে গলাকাটা ব্যবসা করছে হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীদের নানামুখী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অথচ বিদেশে তুলনামূলক কম খরচে ভালো চিকিৎসা করা সম্ভব। ভোগান্তিও নেই। ফলে সামর্থ্যবানরা চিকিৎসার জন্য ছুটছেন বিদেশ। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থাহীনতা, দীর্ঘসূত্রতা আর ভোগান্তিতে বিদেশমুখিতা ক্রমেই বাড়ছে।
গত ১০ বছরে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগী বেড়ে আট গুণ ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে বছরে সাড়ে তিন লাখ মানুষ চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে গিয়েছিল ও তাদের ব্যয় হয়েছিল ২০৪ কোটি ডলার। এখন যাচ্ছে প্রায় ২৭ লাখ ১০ হাজার রোগী। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি জানা গেল দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘বিদেশে চিকিৎসায় ৪৮০০০ কোটি’ প্রতিবেদন থেকে। বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের বেশিরভাগই ১৬-৫৫ বছরের মধ্যে কর্মক্ষম মানুষ, যা মোট রোগীর ৮৪ শতাংশ। রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৬১ শতাংশই পুরুষ, বাকি ৩১ শতাংশ নারী। পেশাজীবীদের মধ্যে ব্যবসায়ীরাই বেশি দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যান। এসব ব্যবসায়ীর মধ্যে থাইল্যান্ড ও ভারতে যাওয়ার সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুরের অবস্থান। গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ রোগের চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশ ও ভারতের তথ্য সমন্বয় করে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি বছর দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে ২৭ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি। এসব মানুষের চিকিৎসা নিতে সেসব দেশে ব্যয় হচ্ছে ৪৮ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতেই ব্যয় হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং দেশটিতে যাচ্ছে রোগীর ৯২ শতাংশ। সে হিসাবে গত ১০ বছরে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা বেড়ে আট গুণ ও তাদের ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
আমাদের দেশে উন্নত চিকিৎসার অবকাঠামো থাকলেও সেবার মান তলানিতে। বিশেষ করে, দেশের বহু চিকিৎসকের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। অন্যদিকে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিনে গড়ে ৫০-৬০ জন রোগী দেখেন। এ কারণে অনেক সময় রোগ নির্ণয় করতেও ভুল হয়। এজন্য দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা এবং ভরসা কোনোটিই জনগণের নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার অভাবে স্বাস্থ্য খাতের কম বরাদ্দ বাজেটও খরচ হয় না। দেশে বেসরকারি খাতে ভালো মানের হাসপাতালও কম। মেডিকেল কলেজগুলোতে ভালো মানের হাসপাতাল নেই। ফলে সরকারি হাসপাতালে অগণিত মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন। আবার যে কটি বেসরকারি হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া যায়, সেগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একই সঙ্গে কতগুলো চিকিৎসা দেশে এখনো হয় না। এর দায় কি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার? এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা নেওয়া বা প্রেরণের পরিমাণ কী হবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যয়ের পরিমাণ নির্ণয় করার বিধানও বিবেচনার দাবি রাখে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশীয় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা এবং দুর্বলতার কারণে মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। আমাদের দেশে চিকিৎসকের তুলনায় রোগী অনেক বেশি। ফলে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর উচ্চচাপ রয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে বেসরকারি খাতের হাসপাতালগুলোতে সেবার মান বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। দেশের টাকা বিদেশে এভাবে চলে যাওয়া অব্যাহত থাকলে ‘স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকীকরণ’ বিষয়টি হবে শুধু কথার কথা। স্বাস্থ্য খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই কেবল থামাতে পারে বিদেশে যাওয়া অর্থস্রোত।
