বাংলাদেশ নারী ফুটবলে নয়া বিজ্ঞাপন সাগরিকা। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এই স্ট্রাইকারের কল্যাণে বাংলাদেশ যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সাফের আসরে। ঠাকুরগাঁওয়ের অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা সাগরিকার ফুটবলার হওয়ার পেছনের গল্পটা এখন কমবেশি সবার জানা। দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে সাগরিকা জানালেন তার গোল করার রহস্য
কেমন আছেন আপনি?
সাগরিকা : অনেক ভালো।
টুর্নামেন্টের আগে কেমন ছিলেন, এখন কেমন?
সাগরিকা : আগে একটু একটু ভালো থাকতাম, এখন অনেক ভালো।
তার মানে এই টুর্নামেন্টের পর আপনার জগৎটা বদলে গেছে?
সাগরিকা : আসলে এত বড় টুর্নামেন্ট আগে কখনো খেলিনি। প্রথম খেলতে নেমেই ভালো করেছি, দলকে সহায়তা করতে পেরেছি। সব মানুষ কত প্রশংসা করছে। সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগছে।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আগে তো আপনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সদস্য ছিলেন। তখন তো সেভাবে নিজেকে চেনাতে পারেননি? এখন যখন ভালো করলেন, সারা দেশের মানুষ জানতে পারল সাগরিকা নামে একটা ভালো স্ট্রাইকারের খোঁজ মিলেছে।
সাগরিকা : এর আগে আমি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে খেলেছি। বাংলাদেশে গত বছর সাফের টুর্নামেন্ট হয়েছিল। সেবারও শিরোপা জিততে পারতাম। তবে রাশিয়ার মতো দল থাকায় পারিনি। এরপর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ ওমেন্স এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রথম রাউন্ডে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হই সিঙ্গাপুরে। তবে দ্বিতীয়পর্বে পেরে উঠিনি। ভিয়েতনামে সব ম্যাচ হেরে বিদায় নিয়েছিলাম। তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল। কারণ অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ওইটাই আমার শেষ টুর্নামেন্ট ছিল। এরপরই ১৯-এর ক্যাম্পে চলে আসি। এবারই প্রথম এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে। তবে আনন্দটা বেশি হতো যদি একক চ্যাম্পিয়ন হতে পারতাম।
ফাইনালের যোগ করা সময়ে গোলটা না করলে তো সেটাও হতে পারতেন না?
সাগরিকা : ফাইনালে যখন ভারত এগিয়ে গেল তার পর থেকে আমাদের মনের অবস্থা কাউকে বোঝাতে পারব না। খুব খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা তো ভোর ৫টায় উঠে অনুশীলন করেছি। টুর্নামেন্টের আগে ভোর, বিকেল দুই বেলা ঘাম ঝরিয়েছি। এর সুফল কি আমরা পাব না? এই টুর্নামেন্ট শুরু থেকেই আমরা ভালো ফুটবল খেলছিলাম। শিরোপার এত কাছে এসেও সেটা হাতছাড়া হওয়ার কথা ভাবতেই পারছিলাম না। তবে আমি আশা ছাড়িনি। বিশ্বাস ছিল একটা সুযোগ পেলে যে করেই হোক গোলটা শোধ করব। শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগটা পেয়ে যাই শেষ মুহূর্তে।
ফাইনালে একটা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। সেই প্রসঙ্গে না-ই গেলাম। শেষ পর্যন্ত শিরোপার স্বাদ পেয়েছেন। আপনি নিজেও তিন ম্যাচে চারটি গোল করেছেন। যার প্রতিটিই দলের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পুরোটা সময় নিশ্চয় খুব উপভোগ করেছেন?
সাগরিকা : অনেক...। কষ্ট হয়েছে তবে অনেক উপভোগ করেছি। শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল এবার ভালো কিছু হবে। কারণ দলে পাঁচজন সিনিয়র জাতীয় দলে খেলা আপু ছিলেন। তাই ভালো করার স্বপ্নটা ছিল। তাদের সঙ্গে খেলে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। আমাদের দলটা আসলে অনূর্ধ্ব-১৭ বয়সীদের নিয়ে গড়া। পাঁচজন কেবল এরচেয়ে বেশি বয়সী ছিলেন। নামে অনূর্ধ্ব-১৯ হলেও আমরা আরও কমবয়সী। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমাদের পারফরম্যান্স আসলেই ভালো হয়েছে।
আপনার বাবা-মা তো রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছেন আপনার কারণে?
সাগরিকা : তাদের কাছে যেতে খুব ইচ্ছে করছে। টুর্নামেন্ট শেষে ক্যাম্প ছুটি হয়নি। তাই তাদের কাছে যেতে পারিনি। ফাইনালের দিন তারা মাঠে এসেছিলেন, তবে বেশিক্ষণ তাদের সঙ্গে কাটাতে পারিনি। তাই বাড়ি যেতে খুব মন চাচ্ছে। আমি ভালো খেলে বাবা-মার মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছি। তারা এক সময় ফুটবলই দেখত না। এখন আমার কারণেই সব খেলা দেখেন। আমাকে অনেক সমর্থন করেন। অথচ শুরুর দিকটাও পরিস্থিতি এরকম ছিল না।
আপনার বাবার ফুটবলের প্রতি অনাগ্রহের গল্পটা তো এখন মুখে মুখে...
সাগরিকা : আমরা ততটা সচ্ছল পরিবার না। বাবা চা বিক্রেতা। আমাদের এলাকায় তাজু স্যার (তাজুল ইসলাম) মেয়েদের ফুটবল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন। রাঙাটুঙ্গিতে তার ফুটবল অ্যাকাডেমিতে অনেক মেয়ে ফুটবল শেখে। সেটা দেখে আমারও খেলার ইচ্ছে জাগে। তবে আমার বাবা কোনোভাবেই চাইতেন না আমি খেলি। তার কথা, মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে, লোকে কী বলবে? বিয়েও তো দেওয়া যাবে না। তবে আমি ছিলাম নাছোড়বান্দা। মায়ের অবশ্য সায় ছিল। তবে বাবা কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না। তখন আমার একজন খালা ছিলেন, তিনি বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এক সময় ব্যর্থ হয়ে বলেন, আমার তো কোনো মেয়ে নেই। এই মেয়েটা আমাকে দিয়ে দে। আমি ওকে লালন-পালন করব, লেখাপড়া করাব এবং অবশ্যই বড় ফুটবলার বানাব। আমিও খুব করে চাইতাম ফুটবলার হতে। একটা সময় বাবার মন গলে। আমি তাজু স্যারের অধীনে খেলা শুরু করি। বাবা এখন আমার খেলা নিয়ে এতটাই আগ্রহী যে টুর্নামেন্ট চলাকালে পাশের গ্রামের আমার এক খালার কাছ থেকে টিভি ধার এনে দোকানে লাগিয়েছে। সেখানে বাবা ছাড়াও অনেকে নাকি খেলা দেখেছেন। আমার গ্রামে নাকি বড় পর্দাটায় আমার খেলা দেখানো হয়েছে।
এর পরের গল্পটা শুনতে চাই।
সাগরিকা : তাজুল স্যার আমাকে হাতে-কলমে ফুটবল শিখিয়েছেন। তার কাছে এক বছর ফুটবল পাঠ নেওয়ার পর তিনি আমাকে বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিতে নিয়ে আসেন। ট্রায়ালে আমি টিকেও যাই। তবে ছয় মাস সেখানে থাকার পর আর ভালো লাগছিল না। তখন বাড়ি ফিরে যাই। সে সময় বাবা অনেক রাগ করেছিলেন। বলেছিলেন এত ভালো পরিবেশ ছেড়ে ফিরে আসা ঠিক হয়নি। তাজু স্যারও খুব আফসোস করছিলেন। তবে আমি স্যারকে বলেছিলাম, আপনার এখানে থেকেই একদিন ভালো খেলতে শুরু করব। স্যার আমার ওপর আস্থা রাখেন। এরপর ২০২২ সালে নারী লিগে খেলি। তাজু স্যার দেখে শুনে আমাকে এফসি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে আসেন। যাতে এই দলের হয়ে বেশি বেশি খেলার সুযোগ পাই এবং নিজেকে প্রমাণ করতে পারি। সেই লিগে আমি সবকয়টা ম্যাচ খেলেছিলাম। আমার খেলা দেখে জাতীয় দলের সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন স্যারের ভালো লেগে যায়। তিনি তখন আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসেন।
তার মানে লাল-সবুজের স্বপ্ন পূরণে ছোটনের একটা ভূমিকা আছে?
সাগরিকা : অনেক বড় ভূমিকা। কতটা সেটা বলে বোঝানো যাবে না। শুধু বলব ছোটন স্যারের সঙ্গে দেখা না হলে আমি ফুটবলার হতে পারতাম না। তিনি আমাকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন। অথচ স্যারের সঙ্গে বেশিদিন কাজ করার সৌভাগ্য আমার হলো না।
সাফ জয়ের পর ছোটনের সঙ্গে কথা হয়েছে?
সাগরিকা : সাফের পর আমাদের ক্যাম্প বন্ধ হয়নি বলে সেভাবে মোবাইল হাতে পাইনি। সপ্তাহে একদিন আমাদের মোবাইল দেওয়া হয়। ছোটন স্যারকে তাই ফোন করার সুযোগ সেভাবে হয়নি। তবে স্যারকে ফোন দিয়ে দোয়া চাওয়ার পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব।
আর বর্তমান কোচ সাইফুল বারী টিটুর কথা কিছু বলবেন না?
সাগরিকা : টিটু স্যার অনেক বড় মাপের কোচ। তিনি আমার ভয়টা কাটিয়ে দিয়েছেন হাতুড়ির ভয় দেখিয়ে (হাসি)। বলতে পারেন হাতুড়ি পেটার ভয়ে গোল করেছি। প্র্যাকটিসে আমি অনেক গোল মিস করতাম নিয়মিত। সেটা দেখে টিটু স্যার খুব রাগ করতেন। আমি বলতাম, স্যার, দেখবেন গেমে ঠিকই গোল করব। তখন স্যার আমাকে বলতেন, আমি মাঠের বাইরে হাতুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। গোল না করলে হাতুড়িপেটা করা হবে (হাসি)। শেষ পর্যন্ত কিন্তু ঠিকই গোল করে টিটু স্যারের আস্থার প্রতিদান দিয়েছি। আসলে স্যার আমাদের প্রত্যেককে অনেক বেশি সাহস দেন। সেটা আমাদের নির্ভীক ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।
এবার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলুন। ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে খেললেন অনূর্ধ্ব-১৯-এ। জাতীয় দলে তো এই জার্সিটি আগে থেকেই কৃষ্ণার জন্য বরাদ্দ। সিনিয়রে সুযোগ পেলে তো দশ পেতে বড় চ্যালেঞ্জ নিতে হবে?
সাগরিকা : আমরা প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখি বড় ফুটবলার হওয়ার ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার। একদিন হয়তো আমার সামনেও সুযোগ আসবে। তার আগ পর্যন্ত আমাকে নিজের সঙ্গে লড়তে হবে। তাছাড়া জাতীয় দলের অনেক বড় বড় তারকা আপু আছেন। তাদের বিট করে জাতীয় দলে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করা মোটেই সহজ নয়। সাবিনা আপু, সানজিদা আপু,
কৃষ্ণা আপুরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেন। তাদের সঙ্গে খেলতে পারাটাই গর্বের ব্যাপার। তারা সাফ চ্যাম্পিয়ন। তাই আমি মনে করি, এখনই সিনিয়র জাতীয় দল নিয়ে ভাবতে চাই না। এখন ভাবনায় শুধুই নিজেকে আরও উন্নত করা। যাতে করে একটা সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জাতীয় দলে সুযোগ পাই। তবে সবসময় চাইব ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে খেলতে।
আপনার সবচেয়ে শক্তির দিক ও দুর্বলতার দিক কী বলেন?
সাগরিকা : আমার মনে হয় আমার গতি আর বক্সে বল পেলে ফিনিশিংটা আমার শক্তি। দুর্বলতা হচ্ছে বল ড্রিবলিংয়ে। এই জায়গাটায় আমাকে অনেক কাজ করতে হবে।
