আলডাস হাক্সলি তার ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ডে ‘সোমা’ নামক এক ধরনের ওষুধের উল্লেখ করেছিলেন। এই ওষুধ খেলে মানুষ তার দুঃখ ভুলে সুখে মেতে থাকে। এই ওষুধের ডোজ বাড়ালে সুখের উন্মত্ততা আরও বেড়ে যায়। হাক্সলির এই ডায়াস্টোপিয়ান ফিকশনে দেখা যায় যে, ভবিষ্যতের এক দুনিয়ায়, প্রযুক্তির উৎকর্ষে, শাসকরা এই কার্যকরী ওষুধ আবিষ্কার করে। আর তা ছড়িয়ে দিয়ে, জনতাকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখে। অভাব, অনটন, পরাধীনতা ভুলে জনগণ সোমায় মত্ত থাকে।
হাক্সলি এই ওষুধের কল্পনা করেছিলেন মাত্র। শাসকগোষ্ঠী এর স্বপ্ন দেখে অনাদিকাল থেকে। রোমের শাসকরা কলোসিয়ামের খেলা দিয়ে লোকজনকে ভুলিয়ে রাখত। এই তত্ত্বকে বলা হতো, ব্রেড অ্যান্ড সার্কাস তত্ত্ব। হাক্সলির মতো আরেক ডায়াস্টোপিয়ান লেখক জর্জ অরওয়েল বলতেন, আধুনিক যুগে ফুটবল হচ্ছে আদি যুগের রোমান কলোসিয়ামের মতো। আনন্দে মত্ত লোকেরা দুর্দশার মূল কারণ খোঁজার সময় বা উদ্যম পায় না। সোমা নামের ওষুধ লেখকের কল্পনা, কিন্তু সবসময় এই কল্পনা যে ওষুধ হিসেবেই বাস্তব হবে, তা কিন্তু না। আমাদের যুগে সোমা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সোশ্যাল মিডিয়া। গবেষকরা মানুষের মনের গহিনে গিয়ে খুঁজে আনেন তার দুর্বলতা। বড়শিতে যেভাবে মাছ গেঁথে ফেলা হয় সেই উপায় কী করলে মানুষকে আরও বেশি সময় স্ক্রিনের দিকে আটকে রাখা যাবে, কী করলে জনতাকে উন্মত্ত রাখা যাবে এর অনবরত চর্চা চলে এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞে। মানুষের আবেগকে যান্ত্রিকভাবে পাঠ করে নির্মমভাবে ফায়দা লোটে এই বিপুল ব্যবসা। এতে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্ত হয়, সংবাদমাধ্যম ও বহু নিরীহ মানুষ, বুঝে কিংবা না বুঝে।
আলাপগুলো নতুন নয়। এই নিয়ে কথা চলছে, চলবে। কিন্তু, আলাপটা আবার সামনে এলো গত মাসে গোপীবাগে ট্রেনে সংঘটিত হওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডে নিহত এক তরুণের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর। দিন দুই আগে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, শরীরের অধিংকাংশ পুড়ে যাওয়া দুর্ভাগা তরুণের নাম আবু তালহা। অবিবাহিত এই তরুণ ছিল সৈয়দপুরের আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ছাত্র। ওপরের আলাপের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী? আমরা যদি মনে করতে পারি, (অবশ্য আমাদের মনে করার মেয়াদ এখন অতি অল্প) তবে স্মৃতিতে ভেসে উঠবে যে- এই প্রায় অঙ্গার হয়ে যুবককে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যেম কী তান্ডব হয়েছিল! কে বা কারা ছড়িয়েছিল যে এই যুবক পুড়ে যাওয়া অবস্থা থেকে বাঁচার চেষ্টা করেননি। কারণ তিনি নাকি বলেছিলেন, তার স্ত্রী-পুত্র মারা গেছে, এই কারণে তিনি বাঁচতে চান না।
এই রোমান্টিক গল্প নিয়ে কন্টেন্ট নির্মাতারা হাক্সলির সোমা সেবনকারীর মতো উন্মত্ত হয়ে উঠল। পিতৃত্বের জয়গানে মুখর হলো, পুরুষের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠল। কেউ সেই বীভৎস পোড়ার দৃশ্যের সঙ্গে জুড়ে দিল বিষাদের আবহ সংগীত, কেউ বা করল নান্দনিক পেইন্টিং। এইরকম একটা মর্মান্তিক দৃশ্য হয়ে উঠল যেন এক শিল্পে! যারা বলল, এই ঘটনা হয়তো সত্য না, তাদের মৃদু স্বর চাপা পড়ল রোমান্স বুভুক্ষু জনতার হর্ষে। তবে, এই কথা বলার মানে এই না যে, যারা এই গণউন্মত্ততায় অংশ নিলেন তারা সবাই দোষী। বরং হরেদরে এই মানুষগুলো নিজেরাই এক বিশাল যজ্ঞের শিকার। আধুনিক যুগে, অবিরাম প্রবৃদ্ধির নামে বেশিরভাগ মানুষকে যে জীবন কাটাতে হয় তা দুর্বিষহ। রাজা সিসিফাসের মতো পাথর গড়ানোর অনিঃশেষ, ক্লান্ত এক রুটিন। এই জীবনের ফাঁদে পড়া মানুষ যে কোনো শুভ দেখলে উত্তেজিত হয়। মানবতার আকালে, ভালোবাসার মরুতে, মানবতা আর ভালোবাসার সামান্যতম আলো দেখলে উদ্বেলিত হয়।
এই ব্যাপারের বিরুদ্ধে লড়াই করা একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব না। চাইলেই এইসব প্রযুক্তি আর সামাজিক বা সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে থাকা যায় না। বিলিয়ন ডলারের বিরাট এক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির লড়াই বৃথা। এই শক্তির লক্ষ্য মানুষের ফোকাস বা মনোযোগ কিনে নেওয়া। স্টোলেন ফোকাস নামক এক চমৎকার বইতে এর বিশদ ব্যাখ্যা দেন লেখক জোহান হারি। এই সুযোগটা কেবল বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিই নেয় তা নয়, পুঁজিবাদের নিয়মে এর কিছু ছোট ছোট ডিস্ট্রিবিউটর বা ফাটকা সুবিধাভোগীও দেখা দেয়। এরা মানুষের আবেগ নিয়ে লাইক, শেয়ারের ব্যবসা করে। বাস্তবকে কোমলভাবে দেখিয়ে, নরককে ফুলের বাগান দেখিয়ে একদল ফায়দা লোটে। ফোকাস ব্যবসা কিংবা কঞ্জুমারিজমের দায় পাশে রেখে ব্যক্তির দিকে আঙুল তুলে মোটিভেশন ব্যবসার নামে চলে ধান্দাবাজি।
দুঃখের বিষয়, এই কোরাসে সঙ্গ দেয় কিছু সংবাদমাধ্যম। দিনশেষ সংবাদমাধ্যমকেও টিকে থাকার জন্য ব্যবসা করতে হয়। আর তার ভয় হচ্ছে, এই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে না দিলে ভিউ হবে না, ব্যবসা হবে না। সত্যমিথ্যা যাচাই না করে, বিরামহীনভাবে সোমার সরবরাহ করার রাস্তাতেই তাই সে হাঁটে। কিন্তু, সংবাদমাধ্যম বা দায়িত্বশীল মানুষদের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো দীর্ঘমেয়াদে ভীষণ ক্ষতিকর। শুধু যে গণমানুষের বিপুল ক্ষতিই এতে সাধিত হয় তা না, এতে করে ক্ষয়ে যায় নির্ভরযোগ্যতা। ব্যবসা সাময়িকভাবে কম হলেও হয়তো সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্যতা হারানো সংবাদমাধ্যমের মূল ভিত্তিকেই আঘাত করবে। সাংবাদিকতার ক্লাসে পড়ানো হয় যে- হোয়েন ইন ডাউট, লিভ ইট আউট। সন্দেহ সাংবাদিকের প্রধান গুণ। এই থেকে সে খুঁতখুঁতে হয়ে সত্য খুঁজবে। সত্য সবসময় আনন্দের হয় না বরং বেশিরভাগ সময়ই তিক্ত হয়। সোমায় বুঁদ হয়ে থাকলে তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব। হাক্সলির সোমা যেমন মানুষকে একটু একটু করে ধংস করে দিত, এই ভাইরাল হওয়ার নেশা, অবিরত আনন্দের নেশা মানবজাতিকেই ধংস করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করছেন, নতুন প্রজন্মের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে , সৃষ্টিশীলতা কমে যাচ্ছে।
হুমায়ূন আহমেদ তার এক লেখায় বলেছিলেন, যত মজা তত পাপ। ঠাট্টাচ্ছলে বললেও ভাইরাল আর মোটিভেশনের ফাঁদ আমরা যারা বুঝতে পারছি তারা কথাটা মর্মে মর্মে বুঝছি। পিটার টুহি নামক এক লেখক এক যুগ আগে একটি বই লিখেছিলেন, বোরডেম বা একঘেয়েমির ইতিহাস নিয়ে। সেখানে তিনি দেখান, একঘেয়েমি মানুষের সৃষ্টিশীলতার জন্য ভীষণ জরুরি। শিল্পের সৃষ্টি, দীর্ঘমেয়াদের সাফল্য আসে একঘেয়ে অবিরাম অনুশীলনে। এই চর্চা, এই লড়াই ভীষণ কঠিন রীতিমতো অসম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক
