রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধ ইটভাটার ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পরিবেশ। ইটভাটার ধোঁয়া আশপাশের গাছপালা, ফসল ও বাড়িঘরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ আশপাশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ ইটভাটা আইনের তোয়াক্কা না করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও প্রশাসন এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে আর্থিক জরিমানা করলেও পরদিন থেকেই আবারও ইটভাটাগুলো বহাল তবিয়তে তাদের কাজ শুরু করে দিচ্ছে। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ মুক্তি পাচ্ছে না পরিবেশ দূষণের ভোগান্তি থেকে।
বন্দর উপজেলার মদনপুর, ধামগড় ও মুছাপুর ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৫২টি ইটভাটা। এগুলোর সিংহভাগেরই নেই কোনো সরকারি অনুমোদন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া ইটভাটাগুলো বিভিন্নভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যে তিনটি ইউনিয়নে ইটভাটাগুলো চলছে, সেই তিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরও রয়েছে ছয়টি ইটভাটা। তাদের পরিচালিত ইটভাটাগুলোরও কোনো অনুমোদন নেই।
কেওঢালা এলাকার ভাটাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ভাটায় পুরোদমে চলছে ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ। ইট পোড়ানোর চিমনিগুলো দিয়ে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। কালো ধোঁয়া ওই এলাকার বাতাসে মিশে মারাত্মকভাবে দূষণ করছে পরিবেশ।
অথচ মাত্র ছয় দিন আগে এ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে এখানকার ১৫টি ভাটাকে আর্থিক জরিমানা করে তা বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অভিযানের পরদিন থেকেই আবারও ইটভাটাগুলো কাজ শুরু করে দিয়েছে।
বন্দর উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা ভাটাগুলোর কালো ধোঁয়ায় ওই এলাকার গাছপালা বিবর্ণ রঙ ধারণ করেছে। এখানে ফল ও ফসলেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। এ ছাড়া আশপাশের স্কুলগুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বায়ুদূষণের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ওই এলাকার জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নাগিনা জোহা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্কুল ও মাদ্রাসার কাছাকাছি একাধিক ইটভাটা থাকার কারণে এখানকার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, যখন একসঙ্গে কয়েকটি ইটভাটার কালো ধোঁয়া বের হওয়া শুরু হয়, তখন শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হয় শিক্ষার্থীদের। এর প্রতিকার চেয়ে কোনো লাভ হয় না। কারণ স্থানীয় প্রভাবশালীরাই ইটভাটার মালিক। তাই ভয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করেন না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি শুষ্ক মৌসুমে ওই এলাকার ইটভাটার মালিকরা প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এই ভাটাগুলো চালিয়ে থাকেন। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন না করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ এলাকায় কোনো ইটভাটাই এ আইন মানছে না।
উপজেলার কেওঢালা এলাকার আবদুল লতিফ জানান, ‘ইটভাটার জন্য আমাদের এলাকার ফলগাছগুলোতে কোনো ফল হয় না। এ ছাড়া সবজিও হয় না। কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে আমাদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।’
বন্দর ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোমেন খান জানান, এই উপজেলার দু-একটি ছাড়া কোনো ইটভাটার পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন রয়েছে কয়েকটি ইটভাটার। পরিবেশ ছাড়পত্র না পাওয়ার কারণে লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ মোজাহীদ জানান, ছাড়পত্র ছাড়াই বেআইনিভাবে চলছে ইটভাটাগুলো।
