ভারতবর্ষের রাষ্ট্রযন্ত্রে মোগল আমলে ফার্সি, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি এবং তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে উর্দুকে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয়। আর সেই থেকে বাঙালি জাতির চিন্তা-চেতনায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় চলে আসে। মহান ভাষা আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও এর কার্যক্রমের মূল সুর বা বাণী বা দাবিই ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। কেননা বাংলা ভাষার যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের মৌল উদ্দেশ্যই হবে বাংলাভাষী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। এটা বাঙালি জাতির জাত্যাভিমানের প্রতি প্রকাশ্য আঘাত। এটা মেনে নেওয়া মানে বাঙালির স্বাধিকার চেতনার মর্মমূলে কুঠারাঘাত এবং প্রকারান্তরে আবহমানকালের সেই পরাধীন পরিবেশে বসবাস। ভাষা আন্দোলনের সৈনিকরা সমগ্র দেশবাসীকে এ সত্যটি উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সাতচল্লিশে ভারত বিভাগ ও ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তিলাভের পর পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে মাতৃভাষা, বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা সংগত কারণেই সোচ্চার হয়ে ওঠে। আটচল্লিশের মার্চে জিন্নার, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ এ উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং তাদের প্রচারণা প্রয়াসে পূর্ববঙ্গের সচেতন ছাত্র-শিক্ষক-জনতা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব গ্রহণ করে। তাদের দৃঢ়চিত্ত প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলোতে বাংলা ভাষা সংগ্রাম উত্তাল আকার ধারণ করে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বুলেটের আঘাতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে ভাষাশহীদরা সেই সংগ্রামী প্রত্যয় ও প্রেরণাকে বেগবান করেছিলেন।
ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র-জনতার মৃত্যুতে গভীর ক্ষোভে তার কালো আচকান কাঁচি দিয়ে কেটে তার পোশাকের সঙ্গে সেঁটে শোকের ও প্রতিবাদের ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। আরও পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেই ১৯২৬ সাল থেকে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী হবে কিংবা পূর্ববাংলার জনগণের মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি প্রদান নিয়ে তার সমসাময়িক বিজ্ঞজনদের মতো ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও চিন্তিত ছিলেন, যুক্তি ও সক্রিয় সজ্ঞানে সোচ্চার ছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কোনো একটি সাধারণ বা সাময়িক ঘটনা ছিল না; এর ছিল সুদীর্ঘ এক পটভূমি। তারও আগে আমরা দেখি ১৯১৮ সালে খানবাহাদুর আহছানউল্লা (১৮৭৩-১৯৬৫) বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলার যথার্থ স্বীকৃতি, বিশেষ করে সমকালীন কিছু বিদ্বজ্জনের উর্দুর প্রতি প্রকাশ্য ওকালতির বিরুদ্ধে তিনি আপনার অভিমতকে যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করেছিলেন।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি মূলত বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধনের দিন। বায়ান্নর একুশের আগের ও পরের ঘটনাবলির একটি সুযোগ্য শীর্ষবিন্দু (Climax) এবং অবশ্যই টার্নিং পয়েন্ট। বায়ান্নর একুশেই বাঙালি জাতি প্রথম প্রমাণ করল ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া যায় এবং এই রক্ত ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে দেয় অদম্য শক্তি এবং অয়োময় প্রত্যয়ের প্রথম শুভ প্রেরণা। বায়ান্ন পর্যন্ত একুশ ছিল আত্মত্যাগ পর্বের প্রস্তুতিপর্ব; আর বায়ান্নর পরের একুশগুলো ছিল স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনে উদ্দীপ্ত হওয়ার পথে প্রেরণার উৎস। বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনে, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নবজাগরণের প্রতিটি মাইলফলকে ভাষা আন্দোলনের চেতনাই বারবার প্রেরণা, দুরন্ত সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে বাঙালি জাতিকে। এসব প্রয়াস-প্রচেষ্টার পথ ধরেই চূড়ান্তভাবে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে মহান বিজয় সূচিত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে ভাষার নামে একটি দেশ, ‘বাংলাদেশ’। পৃথিবীতে এমনভাবে কোনো জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এটি ব্যতিক্রম। বায়ান্নর একুশে মূলত সে অর্থে বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাসের উদ্বোধক। একুশে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত একটি দিন ও তারিখই শুধু নয়; স্বাধীনতার সোপান, জাতীয় মূল্যবোধ ও ভাবাদর্শের বাতিঘর। চীনা জাতির ইতিহাসে ৪ মে যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারি তেমন বাঙালি জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার চিন্তা-চেতনা জাগ্রত হওয়ার দিন।
স্বাধীনতা লাভের পরও একুশ বিভিন্ন সংকট সন্ধিক্ষণে, আপাত বন্ধ্যত্বের কালে জাতিকে জাগ্রত করতে চেতনাদাত্রী হিসেবে কাজ করেছে। একুশের বাণী জাতিকে স্বয়ম্ভর হতেও উদ্বুদ্ধ করে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা।’ একুশের চেতনা কোনো অচল অনুভূতির নাম নয় বরং সচল প্রগতিবাদই এর ভিত্তি। মূল্যবোধ উৎসাহ দেয় পুরাতন জীর্ণ ঘুণেধরা রীতি-রেওয়াজের পরিবর্তন সাধনে। উৎসাহ দেয় বিপ্লব করতে বিদ্রোহ করতে; ঐসব বিবাদ বিসম্বাদের বিরুদ্ধে যা মানুষের আসল পরিচয় মনুষ্যত্বকে হত্যা করে। বিদ্রোহ বিপ্লব তাই নতুন নতুন মূল্যবোধের জন্ম দেয়। আবার মূল্যবোধও বিপ্লব ও বিদ্রোহের সূচনা করে। মূল্যবোধ সৃষ্টির এটা সাধারণ এবং স্বাভাবিক নিয়ম হলেও অনেক সময় পরিবেশের অশুভ হাওয়া যে মূল্যবোধের জন্ম দেয় তা কোনোমতেই কল্যাণকর হতে পারে না বরং তা ডেকে আনতে পারে মানব ভাগ্যের অশুভ পরিণতিকে।
সমাজে যখন নতুন মূল্যবোধের জন্ম হয় তখন পুরাতন মূল্যবোধ ভেঙে যায়। এভাবে চলতে থাকে মূল্যবোধের ভাঙাগড়া পর্ব। যেহেতু এই সমাজের আবহাওয়া, পরিবেশ, প্রতিবেশ সদা পরিবর্তনশীল সেহেতু মূল্যবোধের নবমূল্যায়ন ঘটবে যুগে যুগে কালে কালে বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমায়; এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কখনো যদি এই গতিধারা ব্যাহত হয়, অর্থাৎ পুরাতন মূল্যবোধের সংস্কার না হয় বা যুগের প্রয়োজনে নতুন মূল্যবোধের জন্ম না হয়, তাহলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা দেখা দেয়। বলাবাহুল্য, একুশ শতকের শুরু কিংবা তার আগে থেকে যেন দেশে-বিদেশে সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে প্রতিষ্ঠিত নানান মূল্যবোধের বহুমুখী ও ব্যাপক ভাঙাগড়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দেশের সাধারণ মানুষ একদিন এ শোষণনীতি থেকেই মুক্তি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছিল আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যদি দেখা যায় শোষণ চলছে, অর্থনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দুর্দশা দূর হয়নি বরং বেড়েছে। সমাজে নিঃস্ব হয়েছে আরও নিঃস্ব আর বিত্তশালী আরও বিত্তশালী। সাধারণ মানুষ হতভাগার মতো এসব দেখতে দেখতে তাদের পূর্বের সেই মূল্যবোধ হারিয়ে যাবে। আকাশ সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের পাশাপাশি, নানান উপায়ে যদি চলে অর্থনৈতিক আগ্রাসন, স্বনির্ভর ও স্বয়ম্ভর যোগ্য অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে যদি চলে তাকে অধীনস্ত করার কূট প্রয়াস, জনগণের কথা বলে গণ-অধিকারের অপব্যবহার, জনসেবার নামে যদি জনগণের হয়রানিই বেড়ে চলে তাহলে একুশের মূল্যবোধ মুহ্যমান হয়ে পড়বে।
সবাই দেখছে শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা অনুপ্রবেশ করেছে, প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ আজ যেন অনিমেষ যাত্রী, আদর্শ ছাড়া। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেই সেই পবিত্র সম্বন্ধ। বড় দুঃখের হলেও বলতে হয়, একদিন যে কবি সংস্কৃতিকর্মী শিক্ষক বুদ্ধিজীবি আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার, লিখেছিলেন এন্তার কবিতা ও গান, মেধা ও মনন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধের দেয়াল তারাও যেন ভিন্ন পথযাত্রী সেজে নির্বিকার দর্শকের ভূমিকায়। তারা দ্বিধাবিভক্ত, দলীয় শ্রেণিগত অনিরপেক্ষতায় কোণঠাসা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তেমন উল্লেখযোগ্য সৃজনশীল সাহিত্য চলচ্চিত্র গান রচিত হয়নি। যেমনটি হয়েছিল স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সে অর্থে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো জয়যাত্রা সূচিত হয়নি, বরং অপাঙ্ক্তেয় অগ্রহণযোগ্য বিদেশি সংস্কৃতির বিকৃত উচ্চারণের অভিলাষ যেন অবিরত। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে যে আন্দোলন তার স্বতঃস্ফূর্ততা অর্থবহ হবে, এর যথার্থতা প্রতিপন্ন হবে যদি এ আন্দোলন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কিংবা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মৌল উদ্দেশ্য অর্জনের সালতামামি ও সফলতা ব্যর্থতা পর্যালোচনায় নিবেদিত নিষ্ঠাবান থাকে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা নির্মল নয়, নয় অর্থবহও। অর্থনৈতিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা উদাসীন থেকে কোনো প্রয়াস প্রচেষ্টাকে অর্থবহ পরিণতিতে নিয়ে যাওয়া দুষ্কর।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
