মুখে বলি বাংলা কিন্তু আসলে চাই ইংরেজি

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:২১ এএম

১৯৪৮-এ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যদি বলতেন উর্দু নয়, ইংরেজি হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, তাহলে বাংলার অস্তিত্ব এত দিনে আরও বিপন্ন হয়ে পড়ত। জিন্নাহ নিজের অজান্তে সাময়িকভাবে হলেও বাংলা ভাষার একটি বড় উপকারই করেছেন।

তখন ইংরেজদের বিদায় আসন্ন। তারা আর ভারতবর্ষের ভার বইবে না। দু-টুকরো করে ভারত ও পাকিস্তান বানিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজে নেবে। বিশ্ববাজারে আফিমবিরোধী সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় ভারতের উৎপন্ন আফিমের রপ্তানি-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের অর্থনীতির বারোটা বেজে যাওয়ায় ভারত নিয়ে তাদের ঔপনিবেশিক আগ্রহ শূন্যে ঠেকে যায়। মহাযুদ্ধের ক্ষত শুকোতে ব্রিটেনকে সাম্রাজ্য সংকুচিত করার উদ্যোগ নিতে হয়। ইংরেজরা ১৯০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি শাসন ও শোষণের অনপনেয় কালিতে ঔপনিবেশিক মানস সৃষ্টি করে যেতে সক্ষম হয়। ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেসব আবেগপ্রবণ তরুণ শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা জানানোর পরও বলতে হচ্ছে তাদের বড় ভাইরা কিন্তু ইংরেজ শাসন মেনেই নিয়েছিলেন, এমনকি বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও কবি-সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ‘রাজা দীর্ঘজীবী হোক’ ‘নমি আমি বড়লাটে’ ‘ছোটলাট জিন্দাবাদ’ ধ্বনিসহ ভারতেশ^রী মা ভিক্টোরিয়াকে নৈবেদ্যও প্রদান করেছেন। সেকালে সন্দেহ নেই, পাদ্রিদের হাত ধরেই বাংলা ভাষা প্রাণ পেয়েছে এবং অনেকদূর এগিয়েছে। নববাবু যুগে ইংরেজির চর্চা কম হয়নি। দুজন শিক্ষিত বাঙালি যখন পত্রে ভাবের আদান-প্রদান করতেন, অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজিটাই বেছে নিতেন, ‘কারণ’ বাংলা ঠিক মনের কথা বলতে জানে না। ইংরেজি না জানলে বড়, মেজো, সেজো কিংবা ছোটোবাবু ও মিস্টার হওয়ার যে কোনো সুযোগ ছিল না।

একটা সময় ছিল যখন আইনের দোহাই দেওয়া যেত, ইংরেজরা কেমন করে বুঝবে সেই অজুহাত উত্থাপন করা যেত, বাংলা পরিভাষা না থাকায় অনুবাদের সমস্যার কথা বলা যেত। এমনকি রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা নয় সে কথা বলারও সুযোগ ছিল। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়েছে এবং ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপরও যদি বাংলা প্রচলনে সমস্যার কথা বলা হয় তা গ্রাহ্য করা কি সমীচীন হবে?

১৯৭৫-এ রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশ উদ্ধৃত করা প্রাসঙ্গিক হবে : ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন এটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এই উচ্ছৃঙ্খলতা চলতে দেওয়া যেতে পারে না। এই আদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধা সরকারি অফিসে শুধু বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো অন্যথা হলে ওই বিধি লঙ্ঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন অফিস-আদালতের কর্তাব্যক্তিরা সতর্কতার সঙ্গে এ আদেশ কার্যকর করবেন এবং আদেশ লঙ্ঘনকারীদের শাস্তির বিধান ব্যবস্থা করবেন।’

এমনই কঠোর ভাষায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশ।

তবুও সংবিৎ ফেরেনি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। লক্ষণীয় রাষ্ট্রপতির আদেশটিতে আদালতের উল্লেখ শুধু ‘অফিস-আদালত’ কথাটিতে। এই আদেশটি, তারপরও সঠিকভাবে সব আদালতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারত।

রাষ্ট্রপতির নির্বাহী নির্দেশনামা থেকে মনে করা যেতে পারে এ দেশের সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কর্মক্ষেত্রগুলোতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় লিখতে অতিমাত্রায় সাবলীল ও দক্ষ। কার্যত পরিস্থিতি ভিন্ন। দু-একটি ক্ষেত্রবিশেষ ব্যতিক্রম মেনে নিলে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে গর্ব করার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। বিদেশে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ইংরেজি স্মারকপত্রে স্বাক্ষর করার আগে পুরোপুরি পাঠ করে ভালোমন্দ দিক বিশ্লেষণ ও দেশীয় স্বার্থ সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না, তা বিবেচনায় আনার শক্তি কর্মকর্তাদের অনেকেরই নেই। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কোনো সময় প্রতিপক্ষের প্রশ্নের অর্থ অনুধাবন না করে ভিন্ন জবাব প্রকাশের কাহিনিও অজানা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের তিপ্পান্ন বছরে ইংরেজির জন্য বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছেন এমন দু-চারজন কর্মকর্তার নাম কি জোর গলায় উচ্চারণ করা যাবে? প্রকৃত সত্যটি হচ্ছে, বাংলা কিংবা ইংরেজি কোনো ভাষাতেই রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় যাদের কথা বলা হয়েছে, তাদের কেউ বলার মতো সুকৃতির স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। কাজেই ইংরেজি জানার কথিত কৌলীন্য অসত্য ও অযৌক্তিক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কর্মক্ষেত্রগুলোতে ইংরেজি বা বাংলা কোনো ভাষারই বিকাশ ঘটেনি। করপোরেট কার্যালয়গুলোতে ইংরেজির কিছুটা বিকাশ ঘটেছে।

বাংলার গুরুত্ব না বাড়ার অন্যতম প্রধান একটি কারণ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। ১৭০ বছর আগে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘বহুদিন হইল ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা এই রাজ্যের সমুদয় বিচারালয়ে বঙ্গভাষা ব্যবহার হইবার অনুমতি দিয়াছেন।... কিন্তু বিচারালয়ে বঙ্গভাষা ব্যবহারে অনীহা বিধায় আমরা স্বদেশীয় ব্যক্তিদিগ্যে যদ্রুপ দোষী করিতে পারি গবর্নমেন্টকে তদ্রুপ দোষী করিতে পারি না, কারণ তাহারা ভিন্ন দেশীয় মানুষ, অধুনা এতোদ্দেশের মনুষ্যরা যদি স্বজাতীয় ভাষা শিক্ষা বিষয়ে মনোযোগী হয়েন, তবে অনায়াসে কৃতবিদ্য হইতে পারেন, গবর্নমেন্ট তাহাতে কোনো প্রকার নিষেধ করেন না বরং উৎসাহ প্রদান করেন।’ [কামাক্ষা নাথ সেনের রচনায় উদ্ধৃত]।

বাংলা প্রচলনে সমস্যা নেই সত্যি। কিন্তু বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী কর্মকর্তা কিংবা বিচারক যে প্রশংসিত হবেন, ইংরেজি ব্যবহারকারীকে পাশ কাটিয়ে পদোন্নতি পাবেন, পুরস্কৃত হবেন তার নিশ্চয়তা নেই। সব আবেগ ঝেড়ে মাঠের বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরানো ভালো ইংরেজি জানা প্রার্থীই চাকরিটা আগে পায়, পদোন্নতিও তার আগে। চাকরিচ্যুত হলেও ইংরেজির জোরে কিছু করে খেতে পারে। কারণ বাংলাদেশেও মূল্যটা সংযোজিত হয়েছে ইংরেজি জানা প্রার্থীর বেলায়, বাংলার বেলায় নয়। আকাশ চ্যানেলের কল্যাণে দিনভর রাতভর ঘরে ঘরে এখন যে হিন্দি চর্চা চলছে, ভয় হতেই পারে একসময় না হিন্দির কাছেও না মার খেয়ে যায় প্রিয় বাংলা ভাষা। পশ্চিমবঙ্গে সে মার খাওয়া শুরু হয়েছে অনেক আগেই।

আমাদের বেলায় বাঙালি রাজনৈতিক এলিটরাই উর্দুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এমনকি ১৯৪৭-উত্তর কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি শিক্ষামন্ত্রী (সেই মন্ত্রিপরিষদে দুজন বাঙালি সদস্য ছিলেন, একজন ঢাকার, একজন বরিশালের) আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ নিতে চেয়েছেন।

সংখ্যালঘু জার্মানদের কথা ভেবে জার্মানকে যুক্তরাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপিত হতে যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের প্রথম স্পিকার হিসেবে মূলত জার্মানভাষী ফ্রেডেরিক মুলেনবার্গকে বেছে নেওয়া হয়। তার বাবা হেনরি মুলেনবার্গের জন্ম জার্মানিতে। ফ্রেডেরিকও জার্মানিতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি দুই দফা স্পিকার ছিলেন। তার বিরোধী ভূমিকার কারণেই জার্মানকে সরকারি ভাষা করার বিলটি শেষ পর্যন্ত উত্থাপিত হতে পারেনি। ১৭৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সব ফেডারেল আইন জার্মান ভাষায় প্রকাশের একটি প্রস্তাব মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়।

জার্মান অভিবাসীদের ভাষা শিক্ষার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ১৭৫৩ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, জার্মান অভিবাসীরা ইংরেজি শিখছে না; জার্মানদের মধ্যে যারা হীনবুদ্ধির শুধু তারাই দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আসছে। থিওডোর রুজলেল্ট আমেরিকার জন্য শুধু ইংরেজির কথা বলেছেন, ‘আমাদের একটি পতাকা ও একটি ভাষা।’

ইংলিশ, জার্মান, বাংলা, উর্দু এই ভাষাগুলোর বৈশ্বিক পরিস্থিতি কী?

ইংরেজি ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকার সীমান্ত পেরিয়ে ৫০টি দেশের একমাত্র কিংবা প্রধানতম সরকারি ভাষা। এই হিসেবে ভারতের মতো দেশকে বিবেচনা করা হয়নি। জার্মানি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সরকারি ভাষা। ১৮টি দেশে কমবেশি জার্মান চর্চা করা হয়। বাংলা শুধু বাংলাদেশেই; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে সরকারি ভাষার মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করলেও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে বাংলা ভাষার ব্যবহার, গুরুত্ব ও মর্যাদা দুই-ই কমেছে। বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা যত অহংকারই করি না কেন, এটা প্রকাশ্য স্বীকৃত যে, চাকরির বাজারে ইংরেজি জানা প্রার্থীরই অগ্রাধিকার। শুধু ভালো বাংলা জানা প্রার্থীর ভবিষ্যৎ প্রায় অন্ধকার।

শোচনীয় অবস্থা উর্দুর। পাকিস্তান এবং ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর এখনো উর্দু টিকিয়ে রেখেছে। বিহার, ঝাড়খন্ড, তেলেঙ্গানা, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে উর্দু নিভু নিভু অবস্থায় বিরাজ করছে। ভারতের উর্দু মিডিয়াম স্কুলের পাঁচ ভাগের চার ভাগই বিলুপ্ত হয়েছে, বাকিগুলোও বিলুপ্তির পথে। যে উর্দুকে তৎকালীন সময়ে বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে অবাঙালি আগা খানের কথাতেই বোঝা যায় উর্দু বাঙালিদের নয়। আগা খান ১৯৫১ সালে লিখেছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সফর করেছি। কাউকে উর্দু বলতে শুনিনি।

ভাষার বিকাশ ও বিলয়ের মূল কারণটি অর্থনৈতিক। যে ভাষা মানুষকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সে ভাষার দিকে ঝুঁকবে। জনসংখ্যার বিচারে বাংলা ষষ্ঠ অবস্থানে থাকলেও প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষ ৪০টি ভাষার মধ্যে বাংলা ঠাঁই পায়নি। ফেব্রুয়ারিতে বাংলার জন্য মায়াকান্না বন্ধ রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে প্রযুক্তির ভাষা, অর্থনীতির ভাষায় পরিণত করতে হবে। যতক্ষণ না বাংলা ভাষাকে অর্থকরী ভাষা বলা যাবে এই ভাষার সংকোচন ঠেকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে।

মাতৃভাষা ও ব্যবহারিক ভাষা

মূলত আর্থিক গুরুত্বের কারণে দাপ্তরিক ভাষার চাহিদা মাতৃভাষার চেয়ে বেশি। ইংরেজি যতসংখ্যক মানুষের মাতৃভাষা তার চেয়ে কমপক্ষে চারগুণ বেশি মানুষ দাপ্তরিক ও নিত্যকার ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহার করে থাকে। হাজার বছরের অভিজ্ঞতা ভাষা গবেষকদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে

মাতৃভাষা নিয়ে যত অহংকার যত আবেগ উচ্ছ্বাসই থাকুক না কেন ব্যবহারিক ভাষার গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের ব্যবহারিক ভাষা ইংরেজি। ইংরেজি বহু ভাষাকে উৎখাত করেছে, শিশুদের মুখ থেকে সরিয়ে দিয়েছে মাতৃভাষার বোল। ম্যাথু আর্নন্ড ১৮৬৭ সালেই বলেছিলেন, ‘আমরা যাকে আধুনিক সভ্যতা বলি তার জন্য দরকার সমরূপ ইংরেজি ভাষাভাষী বিশ্ব।’ কিন্তু কীসের বিনিময়ে? আর্থিকভাবে কম গুরুত্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বিলুপ্তির বদলে। শিশু যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়...

সে ভাষার মৃত্যু রোধ করা কঠিন

ভাষা গবেষক ডেভিড হ্যারিসন বলেছেন, শিশুরা সামাজিক মর্যাদার ব্যারোমিটার। আর একজন গবেষক গ্রেগরি এন্ডারসন বলেন, শিশুরা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সেখানে যদি দুটি ভাষা প্রচলিত থাকে, যদি তারা বুঝতে পারে একটি ভাষা অন্যটির চেয়ে কম মূল্যবান তাহলে তারা অধিক মূল্যবান ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়বে, সে ভাষা ব্যবহার করবে। তিনি আরও মনে করেন, একটি ভাষা তখনই বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে যখন সেই ভাষা ব্যবহারকারী সম্প্রদায় মনে করে তাদের ভাষা সামাজিক ও আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের অন্তরায়। যেসব এলাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে এলাকার ভাষা বিপদাপন্নতার চূড়ান্ত স্তরে। হ্যারিসন মনে করেন, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসম্পন্ন বাবা-মা কী করলেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শিশুরা কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তা-ই ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ভাষার অস্তিত্ব বিভিন্ন ধরনের পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করলেও শিশুদের নিজস্ব সিদ্ধান্তই প্রধান নিয়ামক শক্তি। ইংরেজি যে শিশুদের মাতৃভাষা নয়, সারা পৃথিবীতে সে শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাতৃভাষা ডিঙ্গিয়ে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে ইংরেজিকেই বরণ করে নিচ্ছে। তাদের একটি বড় অংশ মায়ের ভাষা আদৌ রপ্ত করছে না।

বাংলাসহ ভারতের সব আঞ্চলিক ভাষা কি বিলুপ্ত হবে?

মারাঠি, বাংলা, গুজরাটি, আসামি, কন্নড়, মালয়ালম, তেলেগু সব আঞ্চলিক ভারতীয় ভাষা কি হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নটি ভারতীয় ভাষা বিশ্লেষকদের। মারাঠি, পাঞ্জাবি, গুজরাটিসহ সব আঞ্চলিক ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা সন্দিহান। হিন্দির দাপটে সব ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের কারণে বাংলা বিলুপ্ত হবে না। এখানে ১৭ কোটি মানুষ সার্বক্ষণিক বাংলাভাষী, অন্যত্র আরও দুই কোটি মানুষের দ্বিতীয় ভাষা বাংলা, দেড় কোটি বাংলাভাষী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে, বাঙালিঘন কয়েকটি দেশ হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসেবে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা হিন্দিভাষীর বেশি না হলেও কাছাকাছি। বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও দাপ্তরিক ভাষা এবং পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের সরকারি ভাষা। লন্ডন, করাচি ও কর্ণাটকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা শেখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সিয়েরা লিওনের শান্তি মিশনে বাঙালি শান্তিরক্ষীদের কৃতিত্বে বাংলা সেখানে সম্মানজনক দাপ্তরিক ভাষা।

ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাঙালিরা ভাষার জন্য লড়াই করতে জানে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬১ সালে আসামের শিলচরে ভাষার লড়াই, দুটিই সফল হয়েছে। তা ছাড়া হিন্দির আগ্রাসন বাংলা ভাষার ক্ষতি করতে পারলেও বাংলাকে গ্রাস করতে পারবে না। বাংলাকে টিকিয়ে রাখবে বাংলাদেশ।

এ আশা তো আমাদেরও। কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত যে বুঝে গেছে চাকরির বাজারে বাংলার দাম নেই, সুতরাং ঘটিবাটি বেচে হলেও সন্তানদের ভর্তি করছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। এখন দু’হাত তুলে বাংলার অমরত্বের জন্য মোনাজাত করার বিকল্প কোনো উদ্যোগ তো চোখে পড়ছে না। যারা উদ্যোগী হবেন, তাদের সন্তানরা এ দেশ ছেড়েছে আগেই, দু-চারজন যারা এখনো যায়, তারা দেশের মায়ায় নয়, ভিসা পায়নি বলে যায়নি। কাজেই যাদের বাংলার জন্য উদ্যোগী হওয়ার কথা, তাদের কীসের এমন ঠেকা?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত