বাতিঘর বুকস্টোর হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালে। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। একুশে বইমেলায় বাতিঘর প্রথম স্টল নেয় ২০১৬ সালে। নিজেদের যাত্রা আরম্ভের কথা বলতে গিয়ে প্রকাশক দীপঙ্কর দাশ বলছিলেন, ‘বুকশপ হিসেবে যেহেতু ভালো করেছিলাম আমরা, পাঠকদের সঙ্গে একটা নেটওয়ার্ক আমাদের ছিল। আমরা ভেবেছিলাম প্রকাশনায় আমাদের ভালো করার সুযোগ আছে। পাঠকরা কেমন বই চান তা আমাদের নিয়মিত জানাতেন, পাঠকদের চাহিদামতো রুচিসম্পন্ন বই করার প্রত্যয় নিয়ে বাতিঘরের যাত্রা শুরু, পাঠকরাই আমাদের অনুপ্রেরণা।’
২০১৬ থেকে ২০২৪ আট বছরে বাতিঘরের অর্জন তার বুকস্টোরের পাঠকদের ধরে রাখা। অর্জন নিয়ে জানতে চাইলে দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘প্রকাশক হিসেবে আট বছরে আমাদের বড় কোনো অর্জন হয়েছে, এমন মনে করি না। বাতিঘর এখনো নবীনই প্রকাশন হিসেবে, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর।’
কোন বিবেচনায় বাতিঘর বই প্রকাশ করে জানতে চাইলে দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘আমরা সবার আগে কনটেন্টটা দেখি, সেটা বইয়ের উপযোগী কি না, তা আমাদের সম্পাদক পরিষদ যাচাই করে, আমাদের মার্কেটিং বিভাগ যাচাই করে বইটা পাঠক কিনবে কি না বা আমরা বিক্রি করতে পারব কি না, তারপরই আমরা সিদ্ধান্ত নিই বইটা করার।’ মেলার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘আমরা বছর জুড়েই প্রস্তুতি নিই বইমেলার। একটা মেলা শেষ হওয়ার পরই মার্চ থেকে জানুয়ারিতেই আমাদের বেশি বই প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে খুবই কমই হয়। এবার ফেব্রুয়ারিতে আমাদের ৬০টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বই আছে, কিছু অনুবাদ, কিছু চিরায়ত, কিছু নতুন বই আমরা এবার চেষ্টা করেছি একটা বৈচিত্র্যপূর্ণ সংগ্রহ যেন থাকে। নানা ধরনের পাঠক যেন বাতিঘরের বই সংগ্রহ করে, সেভাবে আমরা একটা তালিকা তৈরি করেছি।’
অন্য অনেক প্রকাশক যেখানে অডিওভিজ্যুয়াল মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার পর্যন্ত করে, বাতিঘরের সে রকম কোনো উদ্যোগ নেই। প্রচারণা প্রসঙ্গে দীপঙ্কর বলেন, ‘বইমেলায় প্রচারের জন্য আমরা ঠিক বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। এটা আমাদের একটা বড় দুর্বলতা। আমরা শুধু বই প্রকাশ করেই চেষ্টা করছি পাঠকের হাতে কীভাবে পৌঁছানো যায়। তবে আমাদের বড় শক্তি পাঠক, লেখকদেরও একান্ত পাঠক যারা আছেন, তারা। বাতিঘরের প্রতিও পাঠকদের একধরনের আস্থা তৈরি হয়েছে, একজন পাঠক হয়তো আরেকজনকে বলেন, তিনিও বাতিঘরের বই কেনেন। আপনি জানেন আমাদের ৬টি আউটলেট আছে দেশজুড়ে, সেখানে অনেক পাঠক প্রতিদিন আসেন। এভাবে আমরা পৌঁছাতে চেষ্টা করছি। বাতিঘর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব। তবুও আমরা মনে করি আমাদের প্রচারের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে যথেষ্ট।’
সৃজনশীল প্রকাশনার সংকট কী কী জানতে চাইলে এই প্রকাশক বলেন, ‘সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক হিসেবে কয়েক বছরে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, কভিডের পর ইউক্রেন সংকট, আবার শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, এসব কারণে সবকিছুর দাম বেড়েছে, কাগজের দাম অত্যধিক বেড়েছে, দ্বিগুণ হয়েছে, বইয়ের দাম সেভাবে বাড়েনি। কিন্তু টিকে থেকে বইয়ের দাম পাঠকের নাগালের মধ্যে রাখা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিটি বই বের হওয়ার আগেই আমরা বাতিঘরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিকবার বসি বইয়ের দাম কীভাবে পাঠকের নাগালের মধ্যে রাখা যায়, কিন্তু এটা আসলে খুবই অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে অনেকের কাছেই; তবুও মনে হবে বইয়ের দাম বেশি। সংকট উত্তরণের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। পাঠকরা আমাদের ওপর আস্থা রাখছেন, তারা শুধু গল্প-উপন্যাস নয়, নানা ধরনের বই এখন পড়ছে। ভালো বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে, সেটাই আস্থার জায়গা।’
যোগ্য সম্পাদনা পরিষদ নিয়ে ভালো বই প্রকাশ করতে চায় বাতিঘর। বই প্রকাশে আগ্রহী লেখকদের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাইলে দীপঙ্কর বলেন, ‘আমাদের প্রথম প্রত্যাশা থাকে, একটা গোছানো পান্ডুলিপি। এটা পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে যায়। লেখক যদি কমপ্লিট পান্ডুলিপি দেন, আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। আমরা দেখি যে নতুন ধরনের লেখা কি না, পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না বা সেলস টিমের কনসার্ন নিয়ে আমরা মার্কেট যাচাই করে বই করার চেষ্টা করি। এ কারণে অনেক ভালো পা-ুলিপিও আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি। তবে ব্যতিক্রমও আছে, আমরা ঝুঁকি নিয়ে অনেক ভালো পান্ডুলিপিও প্রকাশ করেছি এটা জেনেই যে এই বই কম বিক্রি হবে।’
বাংলা একাডেমির আয়োজনে অমর একুশে বইমেলা নিয়ে বলতে গিয়ে দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘বাংলা একাডেমির ভূমিকা ভালোই মনে করি আমি। এটা স্বীকার করতে হবে, প্রতি বছর যে বইমেলা হচ্ছে তা উত্তরোত্তর নানা জায়গায় ঋদ্ধ হচ্ছে। এটার কিছু পরিবর্তন দরকার। পাঠক-লেখক-প্রকাশককে আরও কীভাবে সম্পৃক্ত করতে পারে, বাংলা একাডেমির তা ভাবা উচিত। স্টেকহোল্ডারদের সৃজনশীলভাবে যুক্ত করা গেলে মেলাটা আরও ভালো হবে। একটা সাহিত্য সম্মেলনও মেলাটাকে সার্থক সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। মেলা যেন শুধু বই বিক্রির জায়গা হয়ে যাচ্ছে, এর পরিবর্তন দরকার।’
