চলমান অর্থসংকটের মধ্যেই প্রতি বছরের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। এবারের সংশোধিত এডিপিতে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ কমছে। গত রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভা হয়। সভায় সংশোধিত এডিপির (আরএডিপি) প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমছে ১৮ হাজার কোটি টাকা, এর মধ্যে বিদেশি ঋণের বরাদ্দ কমছে ১০ হাজার ৫০০ কোটি, সরকারি অর্থায়ন কমছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতি বছরই সরকার এডিপি বরাদ্দ দেয়। তবে কোনো বছরই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে অর্থ বরাদ্দের কোনো মিল থাকে না। ৯ বছর পর গত ১৮ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠক হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে এডিপি বরাদ্দের মিল না থাকার বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ১৮ হাজার কোটি টাকা কমানোর পর সংশোধনীতে তা দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায়।
এবারের সংশোধনীতে সবচেয়ে বেশি কমছে পরিবহন ও যোগাযোগে, ১৪ হাজার কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ থাকলেও এ খাতে বরাদ্দ কমছে ১২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানিতে কমছে ১৩ হাজার ১২৩ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ডলারসংকট, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও কৃচ্ছ্রসাধনের এ সময়ে এবারের আরএডিপিতে একটু ভিন্নতা আনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এবারও সরকার প্রচলিত ধারাতেই হেঁটেছে। এবারের নতুন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী যাতে আগামী অর্থবছরের এডিপিতে অবশ্যই কোনো নতুনত্ব আনেন, সে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ১১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখার পরামর্শ থাকলেও মূল এডিপিতে যথাক্রমে ৬ ও ৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপরীতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যেখানে বরাদ্দ কম দেওয়ার কথা ছিল সেখানে বেশি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখার কথা থাকলেও বর্তমানে বরাদ্দ আছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। পরিবহনে ১৭ শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শকে উপেক্ষা করে রাখা হয়েছে ২৮ দশমিক ৮৮ শতাংশে।
সংশোধিত এডিপিতেও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে খুব বেশি সামঞ্জস্যতা নেই। বিশেষ করে যে কয়েকটি খাতে বরাদ্দ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে কমছে খুবই সামান্য। যেমন পরামর্শ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে বরাদ্দ ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ রাখার পরামর্শ থাকলেও সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ। যোগাযোগ ও পরিবহনে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ রাখার পরামর্শ থাকলেও সংশোধনীতে থাকছে ২৫ দশমিক ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে খুব বেশি মিল নেই যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে।
এবারের সংশোধিত এডিপি কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বছরটা প্রতি বছরের মতো নয়। আশা করা হচ্ছিল সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ে দেখেশুনে ব্যয় করা হবে। কৃচ্ছ্রসাধন হবে, কিন্তু পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকেও সুরক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা গতানুগতিক ধারাতেই চলছে।’ তিনি বলেন, ‘এ সংকটকালে বিশেষ করে বিদেশি ঋণের প্রকল্পে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল। আর যেখানে ডলার পাওয়া যাচ্ছে সেখানে বাস্তবায়ন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। এটি করলে আমরা বুঝতে পারতাম সময়ের প্রেক্ষাপটে তারা গতানুগতিক ধারা থেকে সরে আসছে।’
সূত্র জানিয়েছে, মূল এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ কমছে সবচেয়ে বেশি। মূল এডিপিতে এ খাতে ২৪৪টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৭৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে এ খাতের প্রকল্প বেড়ে ২৫৮টি হলেও এ খাতের বরাদ্দ ১৪ হাজার ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ কমে ৬৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতের বিদেশি ঋণও কমছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। মূল এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগে বিদেশি ঋণের বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বিদেশি ঋণের বরাদ্দ কমে দাঁড়াচ্ছে ২৪ হাজার ১০৩ কোটি টাকায়। এ খাতে সরকারের বরাদ্দ ৪৫ হাজার ৯৫২ কোটি থেকে কমিয়ে ৩৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকায় নামানো হচ্ছে।
বরাদ্দ পাওয়া আরেকটি বড় খাত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। মূল এডিপিতে ১০৪টি প্রকল্পের বিপরীতে এ খাতের বরাদ্দ ছিল ৫১ হাজার ১৯ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রকল্প কমিয়ে ৬৯টিতে আনা হচ্ছে। ১৩ হাজার ১২৩ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকায়। মূল এডিপিতে এ খাতের বিদেশি ঋণের বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, সংশোধনীতে বিদেশি বরাদ্দ কমে দাঁড়াচ্ছে ২৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকায়। মূল এডিপিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ ধরা হয়েছিল, এখন তা কমে দাঁড়াচ্ছে ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
সংকটে থাকা শিল্প ও অর্থনৈতিক খাতেও বরাদ্দ কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরে এ খাতের ৬৫টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে এ খাতের প্রকল্প সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু বরাদ্দ কমছে। এ খাতের প্রকল্প বেড়ে ৭৬টি, বরাদ্দ কমে ৪ হাজার ৬৩০ কোটিতে দাঁড়াচ্ছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গৃহায়ন ও কমিউনিটিতে বরাদ্দ ২ দশমিক ৩ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরামর্শ থাকলেও এ বছর তা রাখা হয়েছে ১১ শতাংশেরও বেশিতে। সংশোধনীতেও খুব বেশি একটা পরিবর্তন হয়নি। সংশোধনীতে বরাদ্দ প্রস্তাব ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গৃহায়নে মূল এডিপিতে ২২১টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২২৯টি প্রকল্পের বিপরীতে ২৮ হাজার কোটি টাকা।
যেসব খাতে বরাদ্দ বেশি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল সেসব খাতেও এবার বরাদ্দ খুব বেশি না কমলেও কিছুটা কমছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। এডিপিতে এ খাতে ৪৭টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সংশোধনীতে এ খাতের প্রকল্প সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৭টি। বিপরীতে বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ থাকলেও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। শিক্ষায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরামর্শ ছিল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। এ বছর এ খাতের বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ২৯ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সংশোধনীতে বরাদ্দ ১২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমানো হলেও প্রকল্প সংখ্যা বেড়েছে এ খাতে। মূল এডিপিতে প্রকল্প সংখ্যা ছিল ১০১টি, সংশোধনীতে প্রকল্প বেড়ে হচ্ছে ১১৮টি।
সরকারকে পরামর্শ দিয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে এখন নতুন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। আগামী অর্থবছরের এডিপি যাতে নতুনত্ব থাকে সেদিকে গুরুত্ব দেবেন তারা; যাতে এডিপির মাধ্যমে সরকার লাভবান হয়।’
