অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখানোর সেকেলে প্রবণতা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ০৯:২৪ এএম

উন্নয়ন অর্থনীতিতে গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট ওরফে জিডিপি একটি বহুল উচ্চারিত ও উৎকলিত শব্দ সমষ্টি কেবল নন্দিতই নয়, বিনম্র শ্রদ্ধারও পাত্র। আগে ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদনে ‘বিনম্রতার’ উপস্থিতি ছিল না মনে করেই ইদানীং অনেক কিছুতেই ‘বিনম্র’ শব্দ জুড়ে দেওয়ার চল চালু হয়েছে। ব্যাপারটাকে অতিভক্তি চোরের লক্ষণ বলে মনে হয়। মুরব্বিকে সালাম কালাম দেওয়ার মধ্যে আন্তরিকতা যখন থেকে কমা শুরু করল, তখন বিনম্রতা বাড়ানোর পথ রচনার সূত্রপাত। অন্যদিকে সদাচার, শুদ্ধাচার, সুশাসন শব্দাবলি বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই তাদের ফিরিয়ে আনার সবক দিতে হচ্ছে শুদ্ধাচারের পদক পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে সুশীল সেবকদের। রুলস অব বিজনেসে কার কী কাজ ও ভূমিকার কথা বলা আছে; তারপরও মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে কর্মপরিকল্পনা ও সম্পাদনা চুক্তি করতে হচ্ছে। সিটিজেন চার্টার জারি করেও জনসেবা-পরিষেবার তালিকা জানান দিতে হচ্ছে।

জিডিপি উন্নয়নের নিরীহ মাপকাঠিতে ব্যক্তি মানুষকে মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় দেখানোর প্রয়াস শুরু হওয়ায় মানুষের উন্নতি-‘উন্নয়ন’-এর পদাবলি সাব্যস্তকরণের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ব্যক্তি মানুষ যেমনই থাক, আর সেখানে জিডিপির অঙ্ক না পৌঁছালেও এমন অনেকে আছেন যাদের আয়-রোজগার আবার জিডিপির আকার অবয়বের যোগফলের চেয়ে বেশি তারা নিজেদের সম্মান আর স্থায়ীত্বের দাবি করতে কসুর করেন না।

‘উন্নয়নের’ শনৈ শনৈ অগ্রগতির রোল মডেলের মতো মেডেল প্রাপ্তির জন্য সাধারণ মানুষ যত্রতত্র ব্যবহৃত হচ্ছি। নেতিবাদীরা আমার এহেন অপব্যবহারে কিংবা অ-উন্নতি (কোনো সম্মানীয় পদবির আগে ‘ভুয়া’ শব্দের পরিবর্তে অ-প্রত্যয় যোগের সদয় নির্দেশনা যেমন দেওয়া হয়) দেখে বিষাদে আপতিত হতে পারেন। তবে ইতিবাদীরা যেন আমার প্রতি আস্থাশীল হচ্ছেন অবিরত। বিশেষজ্ঞ পদবিধারীদের নেতিবাদীরা সমাসের উপধারা উল্লেখ করে ‘বিশেষভাবে অজ্ঞ’ কিংবা ‘অতিরিক্ত’ পদবিধারীদের নিম্নমানের চেয়ার-টেবিল দেওয়া দেখে অতি মাত্রায় রিক্ত (মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস) বলে ভাবতে থাকে। নেতিবাদীদের কাছে শুধু আমার কেন কারোরই কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ে না। তাদের চোখে ছানি পড়লেও পড়তে পারে। কিন্তু তা পরিষ্কার করার ওষুধে যে ভেজাল, প্রক্রিয়ায় (প্রসিডিউর) বিভ্রান্তি এবং প্রয়োগকারীদের রামকানাইয়ের মতো নির্বোধ মনে হয়। আর হবেই বা না কেন, ইতিবাদীদের অতি প্রচার ও অপ্রতিরোধ্য সাফল্যের ধাঁধায় নেতিবাদীদের চোখ কচলানি বাড়ছে বৈকি। ফলে এত উন্নতি তাদের চোখে দাঁড়াতেই পারে না। ইতিবাচক চশমার পাওয়ার বাড়ছে, ফ্যাকো মেশিনে তার রূপ ধরা পড়ছে। উন্নয়ন এখন উচ্চকণ্ঠ হতে পারছে। উন্নয়নের নাম ভাঙিয়ে যে কোনো পদ, পথ পাওয়ার রাস্তা বেরিয়ে আসছে।

জিডিপি আগে এতটা সমাদর ও সুনজরে আসার অবকাশ পায়নি। যখন বিদেশি ঋণ অনুদান নিয়ে উন্নয়ন এমন কি অনুন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন চলত তখন জিডিপি ছিল অতি নগণ্য। কিন্তু যখন থেকে নিজেদের অর্থায়নের সক্ষমতা একটু একটু করে বাড়তে শুরু করল, যখন নিজের সুস্বাস্থ্য শক্তি ও সামর্থ্য দেখানোর প্রশ্নকে সামনে আনা হলো তখন থেকে জিডিপির বহুল ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। জিডিপিই হয়ে গেল উন্নয়নের মাপকাঠি। এখন সবাই জিডিপি ব্যবহার করে উন্নয়ন অর্থনীতির উথাল-পাথাল অবস্থা ঠাওর করানোর ক্ষেত্রে। একে স্পষ্টীকরণের জন্য বছর বছর গ্রোথ অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার দেখানো শুরু হয়ে গেল। জিডিপি যথাযথ হিসাবায়িত হলো কিনা সেদিকে না তাকিয়ে বছর থেকে বছরে আমার ঊর্ধ্ব-অধগতির শতকরা কিংবা অনুপাতে তারতম্য দেখানোর মুন্সিয়ানার চর্চা শুরু হয়ে গেল। প্রচারসর্বস্ব কোনো কোনো উন্নয়ন অর্থনীতিতে জিডিপি হিসাবের ভিত্তি নির্মাণের নথি চালাচালি বেড়ে গেল। কাজির খাতায় দেখানো হলেও গোয়ালে গরুর হিসাব মেলানো যায় না, তা সত্ত্বেও। গোটা দেশের সব মানুষকে আমার উন্নতির গড় হিসেবে দেখার চেষ্টা চলতে থাকল। হঠাৎ করে দেখা গেল, এ সুবাদে উন্নয়নশীল থেকে মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণের পথ খুলে গেল। মাথাপিছু আয় জ্যামিতিক হারের চেয়েও বেশি বেগে বাড়তে শুরু করল। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতিকে আয়ত্তে আনা না গেলেও, দেশের মাথাপিছু আয়ের হিসাব বাস্তবে পকেটে থিতু হওয়া অঙ্কের সঙ্গে মেলানো কঠিন হলেও, প্রচার প্রশংসায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে এটা ধরে নিয়েই উন্নয়ন অর্থনীতির বিজয় নিশান পতপত করে উড়তে শুরু করল। সাধারণ জনগণ তার পকেট ও পাতের প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামিল দেখতে না পেয়েই ‘আমার বলার কিছু ছিল না, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম’ গানের মধ্যে হারিয়ে গেল।   

এটাও বলা দরকার, জিডিপি কোনো দেশের সামগ্রিক বিষয় জানার জন্য কোনো ইনডেক্স বা সূচক নয়। জিডিপি পরিবেশের ডেটাও না, এটা সাইকোলজিক্যাল কোনো ডেটা না যে, মানুষের সুখের পরিমাপ করা যাবে। আমরা অনেকেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জিডিপির তুলনা করে থাকি। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতামত হলো, ‘(এৎড়ংং উড়সবংঃরপ চৎড়ফঁপঃ) বাইবেল, কোরআন, রামায়ণ বা মহাভারতের মতো অতটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতির আকার বা সূচক, যেভাবেই বলা হোক না কেন, ভবিষ্যতে হয়তো জিডিপির কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকবে না।’ তার মতে, ‘জিডিপি নিয়ে নাক সিটকানো মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার হলো চিপায় পড়ে, অন্য প্রকার হলো না বুঝে।’ তিনি জানান, ১৯৩৪ সালের আগে জিডিপির মতো কিছু ছিল না। তবে গত শতাব্দীর প্রায় পুরোটা সময় একটি দেশের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে জিডিপি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অর্থনীতির সূচক নিয়ে ব্রিটিশ আমলে সেভাবে গুরুত্ব দিয়েও বিবেচনা করা হয়নি। একটা দেশের আয়তন বুঝতে আমরা বর্গমাইল বা বর্গকিলোমিটার হিসাব করলেই পেয়ে যাই। কিন্তু একটা দেশের অর্থনীতির আকার বা সাইজ কীভাবে বুঝব? একটি দেশের ভেতরে যত অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছে, এটার সমষ্টিকে আমরা জিডিপি বলতে পারি। আপনি এক কাপ কফি বা চা খেলেন। এটাও জিডিপিতে সংযুক্ত হয়। সেলুনে চুল কাটতে গেলেন সেটার ভ্যালুও যুক্ত হয়। ডাক্তার দেখালেন সেটাও সংযুক্ত হয়। আর্থিক মূল্যের সব লেনদেন জিডিপিতে সংযুক্ত হয়।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে কি উন্নয়নের পরিমাপ করা যায়? জিডিপির মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতির আকার এবং শক্তি প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এটাই অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা শক্তি নির্ধারণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতি। কিন্তু বর্তমানে যে পদ্ধতিতে জিডিপি নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা অসঙ্গতিপূর্ণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অযৌক্তিকও বটে। কারণ এভাবে হিসাবকৃত জিডিপির মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। তা ছাড়া বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের সরকারই তার অর্থনৈতিক সাফল্য প্রদর্শনের জন্য জিডিপির আকারকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ণায়ক সূচক হিসেবে জিডিপি বহুল প্রচলিত এবং সম্ভবত একমাত্র উপায়। কিন্তু জিডিপিতে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার সত্যিকার প্রতিফলন ঘটে না। এ জন্য সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের জীবনমান সত্যিকারভাবে প্রতিফলিত করার জন্য জিডিপি নির্ধারণের বর্তমান পদ্ধতির সংস্কার-আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে একটি দেশের উন্নয়ন পরিমাপ করার অর্থনৈতিক যুক্তি ভীষণভাবে দুর্বল হয়েছে বহু আগেই। অথচ এই উপমহাদেশে এখনো জিপিডি নিয়ে রাজনীতি করতে দেখা যায়!

গত কয়েক দশক থেকেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং সেটির ভিত্তিতে হিসাব করা মাথাপিছু আয়, উন্নয়নের নির্দেশক হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছে। বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ হয়েছে ২০০৮ সালে। সেই সময়ের বিশ^মন্দার মধ্যেই ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি দুজন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ এবং অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিখ্যাত ফরাসি অর্থনীতিবিদ জাঁ পল ফিটুসিকে দায়িত্ব দেন, জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিমাপের সমস্যা এবং এর বিকল্প নিয়ে প্রস্তাবনা দিতে। ২০১০ সালে বের হয় এ তিন লেখকের গবেষণার ফল ‘মিসমেজারিং আওয়ার লাইভস : হোয়াই জিডিপি ডাজনট অ্যাডআপ’ শিরোনামের বইয়ে। বইটির শিরোনামই আমাদের বলে দেয় জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে করা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপ করার সনাতন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষের সত্যিকারে অবস্থার নিরূপণ করে না। তাই বিকল্প পরিমাপ পদ্ধতি জরুরি। এর ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখানোর প্রবণতা বিশ্বে এখন প্রায় বিলুপ্তই হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোতে এখনো ‘সেকেলে’ চর্চাটাই চলছে। ক্ষমতাসীনদের কাছে এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়! অথচ নানা ধরনের পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে একটি দেশের অর্থনীতির সব অর্জন জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জিডিপিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে এবং নারীরা পরিবারের জন্য যে কাজ করছে, তার আর্থিক মূল্য জিডিপিতে যুক্ত হচ্ছে না! একটি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয় এবং নারীরা পরিবারের জন্য যে অবদান রাখে, তার মূল্যায়ন করা হলে জিডিপির আকার অন্তত ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেত। এ পরিসংখ্যানে হয়তো অতিরঞ্জন থাকতে পারে। তবে এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, নারীদের গৃহকর্ম এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক কাজের কোনো মূল্যায়ন বর্তমান পদ্ধতিতে নিরূপিত জিডিপিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না! অথচ নারীদের সব কাজই আর্থিকভাবে মূল্যায়িত হতে পারে। নারীরা যে শিশুদের বুকের দুধ পান করান, তারও আর্থিক মূল্যায়ন হতে পারে। যেহেতু নারীদের গৃহকর্ম এবং অন্যান্য পারিবারিক ও সামাজিক কাজের কোনো মূল্যায়ন জিডিপিতে হয় না, তাই অর্থনীতিতে অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন। আমরা অনেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে উল্লসিত হই; কিন্তু একবারও কী ভেবে দেখেছি যে, এ প্রবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটুকু?

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত