‘আমার মিনহাজ কোন আকাশে গেছে? আর ফিরে আসবে না? মিনহাজকে ফিরে আসতেই হবে। আমার আগে মিনহাজ যেতে পারে না। একবার হজ করেছি। এবার মিনহাজ বলেছে, আমার সঙ্গে হজে যেয়ো। আমার মিনহাজ কই উড়ে গেল?’
ছেলেকে হারিয়ে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে ছেলের কথাগুলো স্মরণ করে বিলাপ করছিলেন মা আমিনা বেগম। ছেলের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে কিছুক্ষণ পরপর মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলে ফের ছেলের নাম ডাকছিলেন।
বেইলি রোডে আগুনে মারা যাওয়া ছেলের লাশ শনাক্তের জন্য শুক্রবার চাঁদপুর থেকে ঢাকা মেডিকেলে আসেন মা। সন্তানের লাশ শনাক্তের প্রয়োজনে মা আমিনা বেগমের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আপনারা এত সব কী করছেন? আমার সোনার টুকরার কিছু হয়নি। তাকে ফিরে আসতেই হবে এবং সে ফিরে আসবেই।’ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিনহাজের মৃত্যুর খবর জানলেও তখনো মাকে জানানো হয়নি।
এদিকে ছেলে মিনহাজকে হারিয়ে বাবা ওয়ালিউল্লাহ খানও শোকে কাতর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছেলে বেসরকারি একটি কোম্পানিতে ভালো চাকরি করত।
ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু আগুন সব শেষ করে দিয়েছে। সন্তানের লাশ কীভাবে কাঁধে বইব। আমার বড় ছেলে কাল রাতে ফোন দিয়ে জানায়, ছোট ছেলে আগুনে আটকা পড়েছে। নিচে নামার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তারপর থেকে আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।’
মিনহাজের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সারা দিন কর্মস্থলে ছিলেন মিনহাজ। সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারের কর্মস্থল থেকে বের হন তিনি। তবে অনেক রাত পর্যন্ত বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। পরে এক বন্ধুর কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, বেইলি রোডের কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন মিনহাজ।
জানার পর থেকে তাকে খুঁজতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কোথাও না পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে খুঁজতে থাকেন। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মিনহাজকে চেনা যাচ্ছিল না। পরে বেলা ৩টার দিকে স্বজনরা হাতঘড়ি দেখে তার মরদেহ শনাক্ত করেন।
মিনহাজ চাঁদপুর উপজেলার মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন। বড় ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বাসাবো এলাকায় থাকতেন মিনহাজ।
এদিকে ছোট ভাই মিনহাজের মরদেহ শনাক্তের পর লাশঘরের সামনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন আমিনুল ইসলাম। তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তারাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আমিনুল ইসলাম জানান, মিনহাজের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লাহ খান। তিন ভাইয়ের মধ্যে মিনহাজ সবার ছোট। তার মা-বাবা চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। রাতে তাদের মিনহাজের বিষয়ে কোনো কিছু জানানো হয়নি। তবে আজ সকালে তারা কোনো মাধ্যমে মিনহাজের খবর জানতে পেরে হাসপাতালে আসেন।
