হোটেল-রেস্টুরেন্টে ঠাসা নারায়ণগঞ্জ শহর। নগরীর চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ভবনেই রয়েছে এক বা একাধিক হোটেল-রেস্টুরেন্ট। আবার অনেক বহুতল ভবনের ছাদে রয়েছে রুফটফ রেস্টুরেন্ট। চাষাঢ়া বালুর মাঠে গ্লাসে ঘেরা দুটি পাশাপাশি ভবনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবগুলো তলাতেই গড়ে উঠেছে নামিদামি সব রেস্টুরেন্ট। এর মধ্যে শুধু একটি ভবনেই কাচ্চি ভাই থেকে শুরু করে সিরাজ চুইঝাল, সুলতান ডাইন, দাওয়াত এ মেজবান, ক্রাউন বাফেটসহ ডজনখানেক রেস্টুরেন্ট আছে। প্রতিদিন যেখানে দুই থেকে তিন হাজার মানুষ খাওয়ার জন্য ভিড় জমায়।
নগরীর বালুর মাঠ এলাকায় দু-তিন বছর আগেও বেশ কিছু বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট বাসা ছিল, সেগুলো এখন রেস্টুরেন্ট। এ ছাড়া শহরের লুৎফা টাওয়ার, জাকির মার্কেট, মেহেদী মার্ট ভবন, ফজর আলী টাওয়ারসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি ভবনের ছাদে রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নতুন শতাধিক রেস্টুরেন্ট চালু হওয়ায় নারায়ণগঞ্জকে অনেকেই এখন রেস্টুরেন্টের শহর বলে থাকেন। কিন্তু রাজধানীর বেইলি রোডে বেশ কয়েকটি খাবার দোকান থাকা গ্রিন কোজি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ হতাহতের ঘটনা ভীতি ছড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জবাসীর মধ্যে। এমনিতেই এই শহরের অধিকাংশ বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত পার্কিং ও অগ্নিকাণ্ডের সময় বিকল্প বহিঃনির্গমন পথ নেই। অগ্নিঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় নাম উঠেছে অনেক ভবনের। এর মধ্যেই এসব ভবনে ব্যঙ্গের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট। বাহারি সব নাম ও চমকপ্রদ প্রচারণায় বহু মানুষ আকৃষ্ট হয়ে এসব রেস্টুরেন্টে খেতেও যাচ্ছেন।
কিন্তু বেইলি রোড ট্র্যাজেডির পর নারায়ণগঞ্জের এসব রেস্টুরেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে শহরবাসী। গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম খলিল তার ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ কি ভবিষ্যতে আরেকটা বেইলি রোডের সাক্ষী হবে? আমাদের চাষাঢ়া বালুর মাঠের সঙ্গে পাশাপাশি দুটি বিল্ডিংয়ে নামকরা ১০ থেকে ১২টি রেস্টুরেন্ট ও একটি স্কুল আছে। এসব রেস্টুরেন্ট ও স্কুলে দৈনিক কমপক্ষে আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৪০০০ লোক আসা-যাওয়া করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এসব বিল্ডিংয়ের কোনো জরুরি বহির্গমন পথ নেই। আল্লাহ না করুন যদি কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তাহলে আর একটা বেইলি রোডের সাক্ষী হবে নারায়ণগঞ্জবাসী।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরে শুধু চাষাঢ়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত প্রায় অর্ধকিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় ৫ শতাধিক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এসব রেস্টুরেন্টের অধিকাংশই নিয়ম মেনে করা হয়নি। শুধু সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চলছে এসব বাণিজ্যিক কার্যক্রম। অনেকগুলো ভবনের ছাদের ওপর রেস্টুরেন্ট খুলে গ্যাস সিলিন্ডারে চলে রান্না।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সিটি করপোরেশনের ফুড অ্যান্ড স্যানিটেশন অফিসার শাহাদাৎ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা হোটেল-রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকি। আবাসিক এলাকায় যেসব রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে, সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই।’ নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেস্টুরেন্ট করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। নারায়ণগঞ্জ শহরে কতগুলো রেস্টুরেন্টের পরিবেশ ছাড়পত্র আছে তা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’
আর নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক ফখরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার বেইলি রোডের ঘটনার পর আমরা রেস্টুরেন্টগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করব।’
