শাখা ক্যাম্পাসের পরিণতি  

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৭ এএম

ভর্তি জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম রোধ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে আর কোনো স্কুল-কলেজে শাখা ক্যাম্পাস থাকবে না। প্রত্যেক ক্যাম্পাসকেই হতে হবে স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে, তারা ওই নামেই পৃথক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে পারবে। তবে একই স্কুল-কলেজের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটি বা প্রতিষ্ঠানপ্রধান হতে হবে পৃথক। কারও সঙ্গে কারও কোনো সংযোগ থাকবে না। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো। দীর্ঘ সময় ধরে অনেকেই বলছেন সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামাফিক শত শত শ্রেণি ও শাখা খুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে কোটি কোটি টাকা আদায় করছে কয়েকটি স্কুল-কলেজ। অধিকাংশই অনুমোদনহীন এসব স্কুল-কলেজের শাখা-ক্যাম্পাস খোলার মূল উদ্দেশ্য থাকে, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তি বাণিজ্য। ফলে কোনোভাবেই ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা উপকৃত হচ্ছেন না। বরং এসব অবৈধ শাখায় শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতার জন্য মাসে মাসে অতিরিক্ত টিউশন ফি গুনতে হচ্ছে।

দেশের নামকরা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একাধিক স্থানে তাদের শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। সেই ক্যাম্পাসগুলো তদারকি করা হচ্ছে মূল ক্যাম্পাসের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে- সার্বক্ষণিক তদারকির ঘাটতি থাকায় এসব শাখায় একদিকে যেমন শিক্ষার মান কমছে, তেমনি অভিভাবক-শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তিতে পড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি শাখা ক্যাম্পাসের জন্য পৃথক ইআইআইএন (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচিতি নম্বর) বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অনেক স্কুল-কলেজের মূল ক্যাম্পাসের বাইরে ব্রাঞ্চ বা ক্যাম্পাস আছে। এর মধ্যে শুধু মূলটির অনুমোদন রয়েছে। এছাড়া কোনো ক্যাম্পাসেরই অনুমোদন নেই। স্কুল চলে শুধু পাঠদানের অনুমতি দিয়ে। বোর্ডের কোনো স্বীকৃতি নেওয়া হয় না। দীর্ঘ বছর ধরে অনেক স্কুল-কলেজ চলছে অনুমোদন-নবায়ন ছাড়াই। অথচ ৩ বছর পরপর তা নবায়নের বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘শাখা ক্যাম্পাস থাকছে না’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে- শাখা ক্যাম্পাস থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্প্রতি নানা ধরনের জটিলতা বেড়েছে। পড়ালেখার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অনিয়ম-দুর্নীতি ভর করেছে। এ অবস্থায় সরকার শাখা ক্যাম্পাসগুলো বন্ধ করে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অভিভাবকরাও এ রকম অভিযোগ করে আসছিলেন। যে কারণে পৃথক ও স্বতন্ত্র ক্যাম্পাসের জন্য সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, শাখা ক্যাম্পাসগুলো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পুরোপুরি ক্ষমতা না পেলে মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও স্কুলগুলোর কাক্সিক্ষত ফল হবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। পাশাপাশি তারা এমনও বলছেন, শাখা ক্যাম্পাস খোলার কারণে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। কোনো শাখার গভর্নিং বডিতে স্থান পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন প্রভাবশালীরা।

এটা সবাই জানেন, বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলে আয়ও বেশি। আর সুবিধাও বেশি নিতে পারেন গভর্নিং বডির সদস্যরা। ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তারা। আন্তরিক ও পক্ষপাতহীনভাবে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সব ধরনের বাণিজ্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমন কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শাখা ক্যাম্পাস বিষয়ে আইন না থাকার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে নীতিমালা প্রকাশের পর শিক্ষা বোর্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি শাখা ক্যাম্পাসের জন্য পৃথক ইআইআইএন নম্বর সংগ্রহের জন্য চিঠি দেবে। তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তাদের অননুমোদিত ক্যাম্পাসের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া দরকার। রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য স্কুলের তিন থেকে পাঁচটি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। তাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারের ওপর। অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থী ভর্তি, শাখা বদলি, শিক্ষক নিয়োগ, কেনাকাটাসহ সব খাতে তারা দুর্নীতি করছে। আর সব শাখা মিলিয়ে একজন অধ্যক্ষ থাকায় দুর্নীতি যেমন বেশি হচ্ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাশাপাশি এমন কথাও শোনা যাচ্ছে- শাখা ক্যাম্পাস বন্ধ হলেই কি দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতি কমবে? নাকি দুর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে! অবশ্য পরিণতি দেখতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত