বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৪, ১২:০৪ এএম

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে অদ্যাবধি সবচেয়ে বড় অর্জন। পশ্চিম পাকিস্তানের সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম এক লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া নিশ্চিতভাবেই ছিল বিস্ময়কর। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ আরও দু-একটি বন্ধু রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা এবং সমর্থনে বাংলার তরুণ বীর সন্তানরা নিজ মাতৃভূমিকে পাকিস্তানি দখলদারমুক্ত করার মাধ্যমে স্বাধীন করে। দেশের জন্য প্রাণ বাজি রাখতে দ্বিধাহীন সেই যুবারা লিঙ্গ, বর্ণ, শিক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদা সৃষ্ট পার্থক্য ভুলে যুদ্ধের ময়দানে একত্র হয় একটি স্বাধীন দেশে শ্বাস নেওয়ার স্বপ্নে। তৎকালীন বাস্তবতায় নিজস্ব একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড এবং একটি পতাকা লাভের প্রয়াসে তাদের যে ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বীরত্ব তাকে শব্দবদ্ধ করা দুষ্কর।

১৯৭১ সালে মাত্র ৯ মাসের সংক্ষিপ্ত অথচ ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয় সত্য, তবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহার শতবর্ষব্যাপী বিস্তৃত। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা ঘটে মূলত বাংলা পতনের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ কায়দায় দেশভাগের পর বর্তমান বাংলাদেশের পরিচয় হয় পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে। যে বাংলা সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রভাবশালী অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সেটিই সার্বভৌমত্ব হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

পাকিস্তান আমলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পূর্ব বাংলা ছিল অবহেলিত এক জনপদ। অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বৈষম্যের শিকার হওয়াকে বেশি দিন সহ্য করেনি। মুসলিম লীগের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া আওয়ামী মুসলিম লীগ ঘোষণা দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের মুক্তি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। অবিসংবাদিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জন্ম হয় শেখ মুজিবুর রহমানের। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিবেচিত বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন জাতির প্রাণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। জনতার ভালোবাসায় যার সান্মানিক নাম হয় বঙ্গবন্ধু। ঘটনা পরম্পরায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ অসংখ্য রাজনৈতিক-সামরিক ব্যক্তিত্ব দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী ভূমিকা ও নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৭১-এ অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের পাশাপাশি, অস্থায়ী সরকারের সদস্য, বুদ্ধিজীবী এবং স্বেচ্ছাসেবকসহ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিপ্রাপ্তির জন্য বিবেচ্য পরিকাঠামো বেশ বিস্তৃত। আমাদের দুর্ভাগ্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতীয় বীরদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা করতে আমরা আজ পর্যন্ত সক্ষম হইনি। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশে যে নির্লজ্জ রাজনীতি হয়েছে তা ব্যাখ্যাতীত। পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো জাতির ইতিহাসে এ রকম ন্যক্কারজনক ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সে বিষয়ে প্রবল সন্দেহ ব্যক্ত করা যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স আজ ৫২ বছর পার হলেও আমরা বাংলাদেশের জাতীয় বীরদের প্রকৃতার্থে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে যথার্থ সম্মান দিতে পারিনি। খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বাইরে বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রের দায় মাসিক বিশ হাজার টাকা ভাতা প্রদান, ক্ষেত্র বিশেষে প্লট বরাদ্দ কিংবা ছোট্ট একটি দালান বাড়ি প্রদান, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার প্রতিশ্রুতি, অন্যান্য সামান্য আর্থিক সাহায্য এবং জাতীয় দিবসে কয়েক মিনিট বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

যে সব মানুষ তরুণ বয়সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধে গিয়েছেন, শত্রুপক্ষের বীভৎস শারীরিক-মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছেন তাদের যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে সম্মান প্রদর্শনের এই প্রচেষ্টা যে ভয়ংকর রকমের কুৎসিত তা উপলব্ধি করার সক্ষমতা আদৌ আমাদের আছে কি? একজন মুক্তিযোদ্ধা নিশ্চয় মৃত্যুর পর সরকারি আয়োজনে স্যালুটপ্রাপ্তি কিংবা পুত্র-কন্যা/পৌত্র-দৌহিত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোটা প্রাপ্তি কিংবা সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির মতো ক্ষুদ্রতর আশা নিয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেননি। যে স্বাধীনতার অর্থ পরিপূর্ণ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে পরিপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কর্র্তৃত্ব স্থাপন; তা কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্তির অর্ধ শতক পার হলেও লাভ করেছি? প্রশ্নটি রাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকর হলেও আজ উত্থাপন করা অতীব জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নির্ণয়, নির্মোহ ইতিহাস বিনির্মাণ কিংবা জাতীয় বীরদের অবদান নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কোনো গবেষণা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। লজ্জাজনক হলেও সত্য যে আমাদের অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ব্যক্তিগত অভিরুচি, সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের জাতিগত গৌরব বর্ণনা করার সক্ষমতা দেখাতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের মতো যেসব নারী সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন, যারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন তাদের বীরত্বের যথাযথ স্বীকৃতি ও নির্যাতিত হওয়ার যন্ত্রণার গ্রহণযোগ্যতা কি সামাজিকভাবে আমরা দেখাতে পেরেছি? তাদের আপন করে নেওয়ার মতো ঔদার্য দেখাতে পেরেছি?

মুক্তিযুদ্ধকালে মার্কিন সরকারের গোপন নথির সূত্র ধরে জানা যায়, বিজয়ের প্রাক্কালে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি চিরকাল বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব ধারণ করা বিদেশি শক্তির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চিকিৎসাপত্র ও পরিকল্পনায় স্বদেশি মীরজাফরদের সহায়তায় আমাদের শিক্ষক, চিকিৎসক, মুক্ত চিন্তক কিংবা পেশাজীবীদের হারিয়েছি। এমনকি আমাদের বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে গেলে অদৃশ্য শক্তির ভয়ংকর প্রভাব আমরা অনুভব করতে পারি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আমরা ফিরে পাব না সত্য, কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছর পার হওয়ার পরও আমরা পেছনে ফিরে তাকালে মূলত হতাশার উপাদান ভিন্ন অন্য কিছু খুঁজে পাই না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর কতিপয় পথভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহায়ক বিদেশি মিলিটারি বাহিনী কর্র্তৃক বিহারি নিধনের যে ঘটনা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটেছে সেটিও বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই। এই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো কখনো ইতিহাসের পাতা থেকে নিরুদ্দেশ হবে না। অন্যায়কে অন্যায় হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত, সেটি আমাদের পক্ষে নাকি বিপক্ষে হচ্ছে সেই সংকীর্ণ চিন্তা দ্বারা আবদ্ধ থাকা যুক্তিসংগত কিংবা কাণ্ডজ্ঞানপূর্ণ নয়।

ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা, সরকারি গেজেট, বাহিনী গেজেট কিংবা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশক্রমে গঠিত তালিকার সমন্বয় করতে না পারার ব্যর্থতা চিরস্থায়ীভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে লজ্জাজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি আজ থেকে অন্তত ৫০ বছর আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। সেটি না হওয়ার পেছনে অজুহাত হয়তো থাকতেই পারে কিন্তু তাতে তৎকালীন শাসকরা দায়মুক্তি পেতে পারেন না। ইতিহাসের কাঠগড়া অতি নির্মম। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে সম্মানজনক অর্জনকে তাই অনুরাগ-বিরাগ-ক্ষোভ এবং পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করা উচিত। ভুলে গেলে চলবে না মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক যে অন্যায় আমরা অব্যাহতভাবে করে চলেছি তার দায় জড়িত প্রত্যেককে উপযুক্ত সময়ে চুকাতে হবে। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা আজ প্রাকৃতিক নিয়মে মহাজীবনের পথে যাত্রা করেছেন। যারা জীবিত আছেন তাদের প্রত্যেকে একেকজন অনন্য উপন্যাস। আমরা তা পাঠ করতে চাই কি?

প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, লোভ-লালসা কিংবা মিথ্যা খ্যাতির মোহ আমাদের সমগ্র জাতিকে এমন প্রবলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে যে বাংলাদেশে শত শত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জন্মগ্রহণ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে সামান্য সুবিধা পেতে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম তুলতে বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা করেনি এমন লোকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত ও সম্মানজনক পদে চাকরিরত ব্যক্তির খোঁজও পাওয়া যায়। উপর্যুক্ত ব্যক্তিরা কি প্রবল লালসা, ব্যক্তিত্ববোধ শূন্যতা এবং আত্মমর্যাদাহীনতার উদাহরণ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে বেঁচে আছে তা কল্পনা করলে শিউরে উঠতে হয়।

সংকট ও প্রবল সম্ভাবনার মুহূর্তে মানব চরিত্রের প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত হয়। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা সেই পরীক্ষায় সম্মানের সঙ্গে পাস করেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার বিশ্বস্ত নাগরিককে দেশ পরিচালনার নানা ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী নিয়োগ করলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের জাতিগত উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত। বিশ্ব মানচিত্রে উজ্জ্বল করত বাংলাদেশ নামটি। অন্তত অসৎ, হীন ও কপটদের ভিড়ে দেশপ্রেমিক জাতীয় বীরদের মস্তিষ্ক নত হওয়ার লজ্জা আমাদের চাক্ষুষ করতে হতো না। 

পরিতাপের বিষয় এই যে রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধের প্রতি সামগ্রিকভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মোটাদাগে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাই আজও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে ক্রমশ ঘৃণ্য মীরজাফর শ্রেণির নবজন্ম ঘোষণা করে অপরাজনীতি করার দুঃসাহস দেখায়। একটি সমন্বিত সুস্থ সমাজ তথা কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণের বদলে আমাদের দেশে আজ অনিঃশেষ বিভেদের সুর বাজে। বিস্মৃত হলে চলবে না যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা তথা আমাদের পূর্বপুরুষরা একটি বিভেদহীন ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কীভাবে আমরা আজ সেই লক্ষ্য বিচ্যুত হয়েছি তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার রক্ত শরীরে বহনকারী সন্তান হিসেবে না হোক, বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে আমার এই প্রশ্ন করার অধিকার নিশ্চয় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত।

লেখক: গবেষক, নোভা ইউনিভার্সিটি অব লিসবন, পর্তুগাল

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত