রাজধানীর বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে প্রাণহানি ঘটল, এর দায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে। একটি বাণিজ্যিক ভবনে কেন হোটেল বানানো হলো, কেন সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, কেন সিঁড়ির গোড়ায় গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছিল, কেন ফায়ার এক্সিট ছিল না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতার বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর রাজউক কর্র্তৃপক্ষ বলেছে, এই ভবনটি শুধু বাণিজ্যিক অফিস ব্যবহারের শর্তে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ এই ভবনটিকে অগ্নিকাণ্ডের জন্য ঝঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনবার নোটিস পাঠিয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করে। প্রশ্ন হলো, নোটিস পাঠানোর পর কর্র্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কেন? শুধু নোটিস দিয়েই কি ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তা তারা কেন করল না? নকশা অনুযায়ী বিল্ডিং হয়েছে কি না তা রাজউকের তদারক করার কথা, কিন্তু তারাও সে কাজটি করেনি। রাজউকের দিকে আঙুল তুললেই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের প্রয়োজনীয় লোকবল নেই! লোকবল নেই কেন? কতদিন তারা এই অজুহাত দিয়ে নিজেদের দায় এড়াবে?
একের পরে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাধারণ মানুষ মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতি। যথাযথ নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব ভবনের অধিকাংশই গড়ে তোলা হচ্ছে ব্যবসা এবং মুনাফার বিষয়টি মাথায় রেখে। যেখানে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী মুনাফা বোঝেন, মনুষ্যত্ব বোঝেন না। মনুষ্যত্ব বোধ তাদের মুখ্য নয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অগ্নিকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু তাদের হৃদয়কে বিশেষভাবে নাড়া দেয় না। এ কারণেই শহরে আগুনের লেলিহানে মানুষের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীতে গত ১৪ বছরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২৬৭ জনের। বিভিন্ন অগ্নিকা-ের পর ঢাকা ট্র্যাজেডির খাতায় নতুন করে নাম লেখাল বেইলি রোড। এ ছাড়া বঙ্গবাজার, নিউ মার্কেটসহ গত কয়েক বছরে ঢাকায় বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন মতে, রাজধানী ঢাকা জুড়ে অগ্নিকাণ্ডের দিক থেকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ২ হাজার ৫১২টি। অনেকটা ‘অগ্নিবোমা’ হয়ে থাকা এসব ভবনে চলছে নানামুখী কার্যক্রম। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৮টি ভবনে রয়েছে মার্কেট ও শপিংমল। অন্যগুলো হাসপাতাল, আবাসিক হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া হাউজ। এসব ভবনে আগুন লাগলে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ, পুরান ঢাকার নিমতলী কিংবা চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ আমরা যদি নিজেদের না পাল্টাই তবে ভবিষ্যতে আরও মর্মান্তিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হবে। একজন নাগরিক হিসেবে এর চেয়ে উদ্বেগের খবর আর কীই বা হতে পারে?
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটা ভবনটির সংশ্লিষ্টদের তিনবার নোটিস দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স মার্কেট ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটেও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত আগুনে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে নোটিস পাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
গণমানুষের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে না। তাদের নৈতিকতা বোধের চরম ঘাটতি লক্ষ করা যায়। সঙ্গত কারণে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সমালোচনার মুখে পড়েছে। জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ‘ক্ষোভ নিরসনে’ অভিযানে নেমেছে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পুলিশ। কিন্তু এই অভিযান চালানো হচ্ছে ফ্রি স্টাইলে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, নিজেদের মর্জি মতো। মানুষের জীবন বাঁচাতে, অগ্নিঝুঁকি দূর করতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান চালাতেই হবে। তবে তা হতে হবে সমন্বিত, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে। অপরিকল্পিত ও লোক দেখানো উদ্যোগের কারণে রাজউক থেকে ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তর পৃথকভাবে কাজ করে কোনো সুফল আনতে পারছে না। দিনে দিনে জনজীবন হয়ে পড়েছে অনিরাপদ, পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি তাদের ওপর হানা দিচ্ছে। রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবারই আলাদা দায়িত্ব আছে। রাজউকের দায়িত্ব সারা বছর ভবনকে নজরদারিতে রাখা। ফায়ার সার্ভিসের কাজ একই। সারা বছরই নজরদারি থাকা দরকার। ভবন নির্মাণ, দাহ্য পদার্থ রাখা, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজউক, তিতাস, পরিবেশ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ ১২ থেকে ১৩টি সংস্থা জড়িত। তাদের প্রত্যেকেরই দায় আছে। এতগুলো সংস্থা কাজ করার পরও কেন এত দুর্ঘটনা ঘটছে? কারণ কেউই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। অথবা নানা প্রতিষ্ঠানের টানাটানিতে অনিয়মের ফাঁদ অপরিবর্তিতই থেকে যাচ্ছে। এ জন্য সব সংস্থাকে নিয়ে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। টাস্কফোর্স হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের নিজের চিন্তা-ভাবনা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। কেন বিকেন্দ্রিকরণের ব্যাপারে নীতিনির্ধারকরা মনোযোগী হচ্ছেন না? সব রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক নির্দেশনাকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে কেন ঢাকার ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন? সারা দেশে বহু ঐতিহ্যবাহী শহর ছড়িয়ে থাকলেও একের পর এক সরকার নিজেদের ক্ষমতা ও কর্র্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করার নীতি গ্রহণ করার ফলে বাংলাদেশ আজ এক-নগরীর দেশে পরিণত হয়েছে। আর এর ফলে অধিক মানুষের চাপ সামলাতে নানা ধরনের বিপদ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিরাজমান দুর্নীতি ও অনিয়মের সংস্কৃতি ভেঙে ফেলার ব্যাপারেও দৃঢ় উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্নীতি ও অব্যবস্থায় অনেকের সুবিধা হয় তাই তারা, ভোক্তা ও বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের প্রতিনিধিগণ, পারস্পরিক সুবিধা বিনিময় করে সহাবস্থান করেন। এতে যুগপৎ দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতি বহাল থাকে, সবার গা-ছাড়াভাবের কারণে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। আর অনিয়মের এই নিয়মে বলি হয় সাধারণ মানুষ। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তাতে অন্তত ১৪টি খাবার দোকান ও রেস্তোরাঁ ছিল। প্রাণঘাতী এ আগুনে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মীদের দায় নিয়ে জোর প্রশ্ন ওঠার মধ্যে পুলিশের করা মামলায় রাজউক কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ হওয়ার’ তথ্য মিলেছে। দুর্নীতির এ চক্র উচ্ছেদ করতে হবে। তা না হলে আবারও সব কিছু ‘ম্যানেজ’ করে মৃত্যুফাঁদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে।
শুধু তাই নয়, অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রেস্তোরাঁ, শিল্প-কারখানাসহ যেসব জায়গায় বহু লোকের সমাগম হয়, সেখানে দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা যাতে বাধ্যতামূলকভাবে রাখা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে অগ্নিদুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না। সরকারসহ সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। এই জীবন রক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে গণরোষ ঠেকানো যাবে না!
লেখক: কলামিস্ট ও লেখক
chiros234@ gmail.com
