‘কোম্পানিকা মাল, দরিয়ামে ঢাল’ ঔপনিবেশিক শাসনামলে দেশীয়রা কোম্পানি তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালামাল লুট করে সেগুলো সমুদ্রে ফেলে দিত। এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যেমন একটা ব্যাপার ছিল তেমনি ছিল আইন না মানার প্রতিরোধ।
গতকাল সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি প্রচ- ব্যস্ত হাইওয়েতে, অনেক উঁচু একটি ডিভাইডার পার হতে লোকজন এক জবরদস্ত কায়দা বের করেছে। রাস্তার দুপাশে দুজন দুটো ছোট মই নিয়ে দাঁড়ানো। একেকজন সেই মইগুলো বেয়ে অপরপাশে নেমে যাচ্ছেন। নেমে যাওয়ার পর মই জোগানকারীদের পয়সা দিচ্ছেন।
এই দৃশ্যটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচ- হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন ‘সেবা প্রদান’ বা ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে বাঙালির সৃষ্টিশীলতা অনবদ্য। কেউ বলছেন এআই আমাদের চাকরি খাবে এই ব্যাপারটা অসম্ভব, কারণ আমরা এমন সব কাজ খুঁজে বের করব যেগুলো এআইয়ের অসাধ্য। কেউ কেউ ক্রুদ্ধ হচ্ছেন এমন কাজে।
আর আমার শুরুতেই মনে হলো প্রথমেই উল্লিখিত লাইনটা। প্রশ্ন উঠবে, কীসের সঙ্গে কী? কোথায় এইরকম উদ্ভট ভঙ্গিতে রাস্তা পার হওয়া আর কোথায় ঔপনিবেশিক আমলের ঘটনা। আমার মনে হয়েছে দুটো ঘটনার যোগসূত্র আছে। আইনকে আমরা কীভাবে দেখি কিংবা আইন আসলে আমাদের কাছে কী? এই প্রশ্নটা সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে কিছুটা বিশ্লেষণ করলে আমরা হয়তো এহেন আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজে পাব।
যুগে যুগে, জটিল ও বৃহৎ সমাজে (রাষ্ট্র) শাসকদের একটা বড় চিন্তা ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে তারা কিছু বিধান নির্ধারণ করে দিতেন। এই বিধানগুলো কখনো হতো পবিত্র ধর্মের নামে কখনো বা দুনিয়াবি প্রয়োজনের তাগিদে। এই বিধানগুলো বড় অংশের মানুষকে মানানোর মধ্য দিয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হতো। আইনের বিধানগুলো ন্যায্য হলে তা অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। এছাড়াও, আইন তৈরির সময় একটা বড় বিবেচনা থাকে ক্ষমতাশালীদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে দুর্বলকে সুরক্ষা দেওয়া।
কিন্তু, এর বিপরীতটাও হতে পারে। অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে যে কোনো প্রতিবাদকেই শাস্তিযোগ্য হিসেবে আইনের বিধান করার উদাহরণ ভূরি ভূরি। ধনীরা নানাভাবে বংশমর্যাদা বা প্রতিপত্তির কারণে অন্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন এই ব্যাপারটাও আইনিভাবে বৈধ করা সম্ভব। তেমনি সম্ভব, আইনি বৈধতা দিয়েই কোনো একটা নির্দিষ্ট জাত, শ্রেণি, গোত্রের মানুষকে নিষ্পেষিত করা। অর্থাৎ, মোটা দাগে আইনি বিধান সবসময়ই ন্যায্যতা ও সর্বজনীন মঙ্গল নিশ্চিত নাও করতে পারে। আইনকে বারংবার প্রশ্ন করে, নতুন উপলব্ধির মাধ্যমে একে সর্বদা সংশোধন করা যায়।
ঔপনিবেশিক আমলের আইনগুলো বেশিরভাগই ছিল শাসকদের একচ্ছত্র সুবিধা এবং প্রজাদের জন্য নিপীড়নমূলক। ফলে, বেশিরভাগ সময় লাঠির ভয়ে আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সুযোগ পেলেই মানুষ আইন ভেঙেছে। কিন্তু, আমরা তো ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়েছি বহু আগে। আমরা এখনো কেন এই ধারণা নিয়ে বসে থাকব? বিশেষত, স্বাধীন দেশে আইন মেনে চলাই যেখানে সমাজের ন্যায্যতা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিতের কার্যকরী উপায়? কেন আমরা ভাবব না যে, আইন মেনে চলার অভ্যাস মূলত সামষ্টিকভাবে আমাদের শক্তিশালী করে? কেন এখনো ‘আইন সবার জন্য সমান’ এই ব্যাপারটা হয়তো জনমানসে প্রোথিত হয়নি। একটু আলোচনা করি।
রাস্তাঘাটে আমরা প্রায়ই শুনি, কেউ আইন ভাঙলে উলটো জিরাফের মতো বড় গলা করে বলে, ‘আমারে চিনোস’? এরপর যদি সে সত্যিই ‘চেনার’ মতো কেউ বা কোনো কেউকেটার আত্মীয় হয় তখন পুলিশেরা বেশিরভাগ সময় সেলাম ঠুকে বিদায় দিতে বাধ্য হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস হোক বা পাতিনেতার গাড়ি, ‘রং সাইড’ দিয়ে চলাটা একধরনের ‘হেডম’। (যদিও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একদম ধরা। এইখানে আবার আইনের কড়াকড়ি এবং মেনে চলার বাধ্যবাধকতা চলে আসে)। হেডমের জোরে আইনকে কাঁচকলা দেখানো একধরনের বীরোচিত তৃপ্তি এনে দেয়। ঢাকা শহরে প্রায়ই দেখা যায়, নানামাপের ‘ভিআইপিদের’ জন্য রাস্তা ফাঁকা করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে রাস্তার দুধারে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একটা প্রচ্ছন্ন বার্তা যায় যে, ‘আইন বা অধিকার সবার জন্য সমান না।‘ শুধু রাস্তা না, সমাজের সব স্তরে এই বার্তাটা যায়।
আবার ফিরে আসি, খোদ আইন প্রণয়নের যুক্তিতেই। রাস্তার সুরক্ষার জন্য রাস্তার মাঝখানে উঁচু ডিভাইডার এবং পারাপারের জন্য ফুট ওভারব্রিজ রাখাটা যদি দস্তুর হয়, তবে, অসুস্থ, শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বারা কীভাবে সে রাস্তা পার হবে? আইন যদি কেবল কঠোর হয়, নাগরিককে যদি এই বোধ না দেয় যে, বিধানগুলো আসলে তাকে ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও সুবিধা দিতে তৈরি, আইন আসলে তার মঙ্গলের পক্ষে, তবে সে সুযোগ পেলেই তা ভাঙবে। আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। আরেকটা জরুরি বিষয় হচ্ছে আইন মানার সুবিধা ও ভেঙে ফেললে শাস্তির ভয়। একেবারে আদিকাল থেকেই, ধর্মীয় বিধান হোক বা জাগতিক, এর মূল আলাপ ছিল এই জায়গাটাকে কেন্দ্র করে।
একবার এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমি যে গাড়িতে ছিলাম তাতে হালকা ধাক্কা লাগে। চাইলে সেই মুহূর্তেই ধাক্কা দেওয়া বাসটির ড্রাইভার গাড়ি থামাতে পারতেন। কিন্তু, তিনি উলটো পাগলের মতো আরও জোরে গাড়ি চালিয়ে দিলেন। একেবারেই অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে ফেরার পর একাধিক ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম সেদিনের ড্রাইভারের ওই আচরণের কারণ।
তারা বলেছিলেন, ড্রাইভার জানে যে, যদি সে কয়েকটা মানুষকে পিষেও দিয়ে যায় তবে কিছু উৎকোচ দিলেই সে বেঁচে যেতে পারে, কিন্তু যদি ‘ভালোমানুষি’ করতে গিয়ে গাড়ি থামায়, সম্ভাবনা আছে গণপিটুনি খাবার। কারণ, জনমনস্তত্ত্ব হচ্ছে ‘ঘাতক ড্রাইভারকে পুলিশ ছেড়ে দেবে, একে যা শাস্তি দেওয়ার আমাদেরই দিতে হবে।’ এই মনস্তত্ত্ব আইনের শাসন সঠিকভাবে মানা হয় না সেই বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। একটা বিশ্বাস চলে আসছে যে, আইন মানলেই সমস্যা, না মানলেই বরং লাভ।
‘আইন ভাঙায়’ মইওয়ালা সম্ভবত শাস্তি পেতে চলেছেন। ভাইরাল ইস্যুকে নিয়ে পুলিশ সরব হবে। কিন্তু, কেবল শাস্তি দিলে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াতে লোক হাসাহাসি করলে এইসব থামবে না। নিশ্চিত করতে হবে যে, রাস্তার ডিজাইন এবং আইন এমনভাবে করা যা বেশিরভাগকে সুরক্ষা এবং নিশ্চয়তা দেয়। তা না হলে, আজ মই থামালেও আগামীকাল লোকে ঘাড়ে চড়ে পার হবে।
একটা চরম উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। শহরে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ টয়লেট না থাকে, সেগুলো ব্যবহার সহজলভ্য না হয়, তবে যতই আইন থাক, সুযোগ পেলেই, চাপে থাকা মানুষ এই কর্মটি যত্রতত্র রাস্তায় সেরে ফেলবে। রাস্তা পারাপার বলি আর যে কোনো দুর্নীতির ক্ষেত্রেও এই আলাপটা প্রযোজ্য। আইন যতক্ষণ ন্যায্যতা এবং বাস্তব সুবিধা দিতে না পারছে, আইনকে যতক্ষণ বেশিরভাগ মানুষ নিজের রক্ষাকবচ ভাবতে পারবে না, আইনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা থামানো কঠিন হবে।
লেখক : সাংবাদিক
