মন্ত্রী মেয়র মশা

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৪, ০৩:০০ এএম

পৃথিবীতে অন্য যে কোনো প্রাণীর তুলনায় মশার কারণে বেশি মানুষ মারা যায়। সংখ্যাটা বছরে ১০ লাখের মতো। মাত্র আড়াই মিলিগ্রাম ওজনের এই কীটের কারণে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা সাপের কামড়ে মরে যাওয়া মানুষের প্রায় দশগুণ।

এই ঘাতক কীট এতটাই বেপরোয়া যে, সে কাউকেই পরোয়া করে না। এমনকি বাংলাদেশের মন্ত্রী, মেয়র আর প্রভাবশালীদেরও না। দেশ রূপান্তরে ছাপা হওয়া এক ছবিতে সে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আর বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টর খালপাড়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের ‘মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম’ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাজউকের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞাসহ ঢাকা উত্তর সিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠান চলাকালে মন্ত্রী, মেয়র, অন্য অতিথিসহ উপস্থিত সবাই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়েছেন।

মশা মারতে কামান দাগা প্রবাদটা একসময়ে বাড়াবাড়ি অর্থে বোঝালেও, বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে শয়ে শয়ে কোটি টাকা খরচ করেও ঢাকা সিটি করপোরেশন মশক নিধনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। খোদ মেয়রের মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে যাওয়ার ছবি আর সংবাদ এর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

বিপুল বরাদ্দ আর চেষ্টার পরেও মশা নিয়ন্ত্রণে অসফল মেয়র অনেকটা দায় চাপাতে চাইলেন জনগণেরই ওপর। তিনি বলেন, ‘এডিস মশার জন্য যার যার ঘর, অফিস-আদালত তাকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমার কাছে কিন্তু অসম্ভব, কারও বাড়ির ছাদে পানি জমে আছে কি না, তা দেখা। এটি এডিস মশার জন্য সবাইকে সামাজিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি আঙুল তোলেন অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকেও। মেয়র বলেন, ‘গুলশান-বারিধারার মতো লেকে মশার জন্ম হচ্ছে। শুধু সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে মশা নিধন অসম্ভব ব্যাপার। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যে খালে আজ কাজ করা হচ্ছে, সেটি রাজউক ও ওয়াসার খাল। অনেকবার খালটিকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে দিতে বলেছি। রাজউককে বলেছি, ওয়াসাকে বলেছি, কিন্তু কেউ পরিষ্কারে এগিয়ে আসেনি। নিজেদের মধ্যে এমন চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত জনগণ কষ্ট পাচ্ছে।’

শেষ কথাটাই নির্মম সত্য। নিজেদের কষ্টার্জিত করের টাকায় নাগরিক সেবা না পাওয়া নাগরিকরা অসহায় হয়ে অপেক্ষা করছেন আরেকটা ডেঙ্গু মহামারীর। বছরের প্রথম আড়াই মাসেই, যখন শীতের কারণে ডেঙ্গুর প্রভাব কিছুটা কম, ২১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। বৃহস্পতিবারের অন্য এক প্রতিবেদন অনুসারে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানীতে ভর্তি হয়েছেন তিনজন, ঢাকা বিভাগে তিন, চট্টগ্রাম বিভাগে ছয় ও বরিশাল বিভাগে দুজন।

সামনে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা। খোদ নগরপিতার মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হওয়া ছবি এবং অন্যদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা তাই নিশ্চিত করে। নির্মম হলেও সত্য যে, ধনী ও ক্ষমতাশালীরা বিভিন্নভাবে নিজেদের ঘরে মশকের আগমন ঠেকাতে পারলেও এর সামনে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন নিম্নবিত্তের মানুষরা।

নগরপিতা সরকারি আমলাতন্ত্রের কারণে মশা নিধনে অক্ষম নাকি অসহায় সেই বিবেচনার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, এই মহামারীতে ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ, গোটা শহরের মানুষকে করে তুলছে অসুস্থ এবং কমিয়ে দিচ্ছে কর্মক্ষমতা। সিটি করপোরেশনসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠান তাই কত দ্রুত এই ভোগান্তি কমাতে পারবে সেটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত