রাশিয়ার মতো নজিরবিহীন ভাঙন-পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে খুব কম দেশ বা জাতিকে যেতে হয়েছে। সে পশ্চিমের অনুরূপ ধর্ম গ্রহণ করে, অথচ এর সঙ্গে পূর্বপুরুষের আচার মিশে এর চরিত্রই পাল্টে দেয় এবং একই ধর্ম থাকার পরও পশ্চিম তার ‘গুরুভাই’ নয়। সে পশ্চিমের নৈকট্য চেয়েছে, কিন্তু সে ইতিহাস পশ্চিমের প্রতারণায় পূতিগন্ধময়। রাশিয়ার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রুশ চরিত্রের এই ‘অনন্যতা’ এবং ইতিহাস মাথায় থাকা জরুরি।
নির্বাচনে পুতিন নিরঙ্কুশভাবেই জিতবেন এটা অনুমিতই ছিল। রাশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে যারা ন্যূনতম ধারণা রাখেন এবং পশ্চিমা চশমা খুলে রেখে নিরপেক্ষভাবে বুঝতে চান, তারা জানেন যে, বিগত কয়েক বছরে পুতিন ছাড়া নির্বাচনে জিতে আসার মতো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই। এমনকি যে নাভালনির কথা বলা হয়, তিনি তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়েও শহুরে লিবারেল মধ্যবিত্তের বাইরে ততটা জনপ্রিয় ছিলেন না। আমার এক দশকের রাশিয়া থাকাকালীন আমি তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেখেছি এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভোটদানে প্রবল অনাগ্রহ লক্ষ্য করেছি। অথচ এবার নানা ভোটকেন্দ্রে তরুণ ভোটারদের লম্বা লাইন দেখেছি।
এর কারণ কী? কারণ, রাশিয়া একটা যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত এবং ইতিহাস বলে, এ রকম সময়ে রুশরা ধর্ম-বর্ণ-আদর্শ নির্বিশেষে নিজেদের রুশ আইডেন্টিটি পুনঃনিশ্চিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যার অন্যতম উদাহরণ। তো এখনকার যুগসন্ধিক্ষণের অর্থ কী? সমাজবিজ্ঞানে আমরা শিখি, মানুষ প্রবৃত্তি এবং যুক্তির সঙ্গে ক্রমাগত তর্করত। প্রবৃত্তি আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সংগঠিত হওয়ার পথে চালিত করে। বিবর্তনের এই পথ ধরে ‘আমরা’ এবং ‘অপর’ বর্গ তৈরি হয়। প্রত্যেকে নিজের বর্গের প্রতি অনুগত থাকে। অন্যদিকে প্রবৃত্তির বাইরে মানুষের র্যাশনাল বা যুক্তিবোধ থাকে। এই যুক্তিবোধ থেকে সে তার নিজের বর্গের বাইরের বর্গকে স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। ভূরাজনীতিতে বৃহত্তর মানবতার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য ‘অপর’-এর চোখ দিয়ে বাস্তবতা মূল্যায়ন করতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখতে পাই সামষ্টিক পশ্চিম দ্বারা রাশিয়ার ক্রমাগত ‘অপরায়ণ’। পুতিনের জনপ্রিয়তার বড় কারণ এই ‘অপরায়ণ’ ঘনীভূত হতে থাকা। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন কী ভয়ানক বাস্তবতা নিয়ে এসেছিল, এর জনসাধারণের ওপরে সেটা কল্পনাতীত। এর রেশ এতই প্রবল ছিল যে, সে সময়ের জনসংখ্যা হ্রাসের রেশ এখনো রাশিয়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কাজ করি, সেখানে পেরেস্ত্রইকার সুবাদে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রচুর আমেরিকান প্রফেসর আসতে থাকেন। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে তৎকালীন সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক নীতি তৈরি হতে থাকে। ইয়েলেৎসিনের পরে পুতিন যে রাশিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন সে রাশিয়াকে বলা হতো আমেরিকার এককালের ওয়াইল্ড ওয়েস্ট। একদিকে চূড়ান্ত দারিদ্র্য, অপরাধ; অন্যদিকে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বিলিওনেয়ার। কেবল তাই নয়, রাশিয়ার রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সংকট দেখা দেয়। ন্যাটো ক্রমাগত পূর্বদিকে সম্প্রসারিত হতে থাকে। এর ফলে একটা সম্মিলিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গঠন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসবের একটা রূপরেখা আমরা দেখতে পাই ১৯৯০-এর চার্টার অব প্যারিস ফর এ নিউ ইউরোপের নথিপত্রে। রাশিয়া যত দুর্বল হবে, ততই তার জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করা যাবে। এর অসংখ্য নজির নব্বই এবং শূন্য দশকে দেখা গেছে।
পুতিনের প্রথমবার দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে সবাই ধরে নিয়েছে, রাশিয়ার আরেকটি ভাঙন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তার প্রতি সে সময় অভিযোগ ছিল যে, তিনি একটা অলিগার্ক গোষ্ঠী তৈরি করেছেন নিজের টিকে থাকার স্বার্থে। বাস্তবতা হলো, পশ্চিমের প্রেস্ক্রাইব করা অর্থনৈতিক ‘শক ডকট্রিন’ নীতির বদৌলতে ততদিনে ইতিমধ্যেই অলিগার্কির জন্ম হয়েছে, যাদের হাতে সব অর্থনীতির চাবিকাঠি। তাদের উপেক্ষা করার শক্তি একজন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্টের ছিল না। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আজকের রাশিয়া ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি, এর সামরিক শক্তি আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ পুতিন তার পলিসি রাজনৈতিক অলঙ্কারশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করেন না। তিনি জনতুষ্টিবাদী নন, এর আরেকটি প্রমাণ ইউক্রেনে চলমান বিশেষ সামরিক অভিযান। এই অভিযানের সিদ্ধান্ত মোটেই জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু একটা সময় পরে রাশিয়ার জনগণ এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। যার প্রতিফলন এই নির্বাচন।
দুবছর ধরে এত বিপুল একটা সামরিক অভিযান চলার পরও রাশিয়ার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, ইউরোপের তুলনায় এর মূল্যস্ফীতি কম, বিশেষ করে খাদ্যে। এর কারণ যে অলিগার্করা তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, যারা দেশের টাকায় বিদেশে বিনিয়োগ করত অথবা বিলাসবহুল সম্পদ কিনত, আজ তারাই পুতিনের রাজনৈতিক কৌশল ও চাপে দেশে বিনিয়োগ করছে। অলিগার্কির ট্রান্সফর্ম ঘটছে দেশীয় পুঁজিপতিতে। যুদ্ধের রেশে দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রায় সব জায়গার চেয়ে সহনীয়। অথচ পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা মেশিন গত দুবছরে প্রতি দুদিনে রাশিয়ার অর্থনীতি ধসের ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছে। এসবই পুতিনের জনপ্রিয়তার কারণ।
প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে। ৩৬টি দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষক রাশিয়াতে। সব মিলিয়ে ২০০-এর ওপরে পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন। এরা প্রত্যেকেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মত দিয়েছেন। ২০২০ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন। কেউ কি সেই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে? ধ্রুপদি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই যে ‘স্বীকৃতি’ দেওয়া, এর সময় ফুরিয়েছে। রাশিয়া আর নব্বই দশকে ফিরছে না। সে ধীরে ধীরে তার আত্মপরিচয়ের সংকট কাটিয়ে উঠছে। সামষ্টিক পশ্চিমের ‘স্বীকৃতি’ তার আর দরকার নেই। একটা নতুন সমৃদ্ধ বহু মেরুর বিশ্ব নির্মাণে সে বদ্ধপরিকর।
লেখক : পিএইচডি রিসার্চ স্কলার ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকস, মস্কো
