ভারতে নির্বাচনের আগে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

আগামী ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুন পর্যন্ত ভারতের লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ৪৭ দিন ধরে চলা এই নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হবে ৪ জুন। পূর্ণাঙ্গ ফল পেতে আরও দুই দিন লাগতে পারে। বাংলাদেশের মতোই এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

পাকিস্তানেও একই ঘটনা। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৯০ কোটি। পশ্চিমবঙ্গের মোট আসন ৪২টি। এই ৪২টি আসনের জন্য ৭ দফায় নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী এপ্রিলের ১৯ ও ২৬, মের ৭, ১৩, ২০, ২৫ এবং জুনের ১ তারিখে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন আকারে খুবই ছোট। তিন জনের কমিশন। আইন পরিবর্তন করে, মাঝে কিছুকাল ১ সদস্য বিশিষ্ট কমিশন তৈরি করা হয়েছিল। পরে যদিও ৩ সদস্যের কমিশনে ফেরত গিয়েছে ভারত। ঘটনাক্রমে এই মুহূর্তে ভারতে ১ সদস্যের কমিশন। একজন সদস্য নিয়মিত অবসরে গিয়েছেন, অন্যজন কিছুদিন আগে পদত্যাগ করেছেন। এই পদত্যাগ অনেকগুলো প্রশ্ন তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে পদত্যাগ মানুষ কৌতূহলী হবে এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বেশ কিছু বিধিনিষেধ এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। যেমন পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যকে বলেছে, তিনটি নাম প্রস্তাব করার জন্য। কমিশন এই তিনটি নামের মধ্য থেকে একটি নাম চূড়ান্ত করবে পরবর্তী রাজ্য পুলিশ প্রধানের জন্য। অনেকগুলো রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইতিমধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের নির্বাচনব্যবস্থায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ফোর্স দায়িত্ব পালন করে থাকে। যা মূলত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ফোর্স বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হয়। নির্বাচনের সময় রিজার্ভ ফোর্সের কেউ নিজ রাজ্যে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। যে কারণে রাজ্যগুলোতে নির্বাচন পরিচালনার সময়ে তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষ থাকে।

পৃথিবীর বৃহৎ সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশটিতে এবার নির্বাচনের আগে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্না হাজারের নেতৃত্বে দিল্লির যন্তর মন্তরের ন্যায়পাল আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে উঠে আসা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তার করেছে ইনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ইডি। যারা মূলত কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আবগারি আইন সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ইনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট তাকে ৯ বার সময় দেওয়ার পরেও তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপস্থিত হননি। তার পক্ষ থেকে প্রশ্ন ছিল ভারতীয় সংবিধানের বিধিবিধান অনুসারে, একজন মুখ্যমন্ত্রীকে ইডি অর্থাৎ ইনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট তলব করতে পারে কিনা? বিষয়টি প্রথমে কেজরিওয়ালদের আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে দিল্লি হাইকোর্টে এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু দিল্লি হাইকোর্ট এ বিষয়ে কোনো আদেশ দিতে অপারগতা জানালে, ইডি সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করে কেজরিওয়ালকে যিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম ঘটনা, যেখানে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার হলেন। যে বিষয়কে কেন্দ্র করে এই মামলার সৃষ্টি, তা হলো দিল্লি সরকার ২০২১ এর নভেম্বর মাসে মদ বিক্রির খাতে কিছু আবগারি আইন তুলে নেয়। যার মধ্যে ছিল মদ বিক্রির জন্য লাইসেন্স, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে আবগারি ভিন্ন। পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর মদ বিক্রেতা কোম্পানিরা দিল্লিতে মদের দোকান করার সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল এবং আইন পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা তাদের মদ বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। যদিও তা দিল্লি সরকারের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক ছিল। দিল্লি সরকার প্রচুর আবগারি কর আদায় করতে পারছিল। কিন্তু সংবাদ হলো, কেজরিওয়াল ও তার দল এর মাধ্যমে ওই মদ বিক্রেতা কোম্পানির কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেছে। এই হচ্ছে মূল অভিযোগ।

সম্প্রতি নির্বাচনী বন্ড ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রকাশিত বন্ড ক্রেতাদের নামের তালিকায় এমন সব লোকের নাম সামনে আসছে, যারা দিল্লিতে কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে বন্ড কিনে সহায়তা করেছিল এবং সেই টাকা দিয়ে পার্টি পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় নির্বাচনের ব্যয় নির্বাহ করেছে। সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্ট এই বন্ড ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে এবং রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কাছে বন্ড ব্যবস্থায় যে ব্যক্তি কোম্পানি দলসমূহকে বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন করেছে, তাদের নামের তালিকা সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রকাশ করার নির্দেশ প্রদান করেছে। এই নির্দেশনা বিজেপিকে বিপদে ফেলেছে। কারণ নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিজেপি যত টাকা বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে গ্রহণ করেছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ বিদ্যমান। রাজ্য হলেও দিল্লির পুলিশ কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য রাজ্যগুলোর পুলিশ রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। তবে দিল্লি একটি সংসদ দ্বারা পরিচালিত হয়। দিল্লি বহুকাল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। আন্না হাজারের সেই ন্যায়পাল নিয়োগের আন্দোলনের পরে সে আন্দোলনের দুজন বিখ্যাত ব্যক্তি রাজনীতিতে আলাদা হয়ে পড়েন। একজন কেজরিওয়াল অন্যজন কিরণ বেদি। কেজরিওয়াল আম আদমি পার্টি গঠন করেন এবং কিরণ বেদি বিজেপিতে যোগ দেন। তিনি বিগত দিল্লি নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেন। কিন্তু তার সে নেতৃত্ব জয়লাভ করতে পারেনি। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগের এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্টের এই পদক্ষেপ সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। এর সঙ্গে আছে কংগ্রেস দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বাৎসরিক হিসাব-নিকাশ দাখিল করার যে বাধ্যবাধকতা নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের রয়েছে এবং তারা যে আর্থিক বিবরণী পেশ করেছে- তাতে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। বলা হচ্ছে যে, সেই সময়ের কংগ্রেসের আর্থিক বিবরণীতে অমিল আছে। এত বছর পরে এই প্রশ্ন তুলে কংগ্রেসের অর্থ আটকে দিয়েছে ইনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট। ভারতের ইনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্টের এই কার্যক্রমগুলো, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই করা হচ্ছে বলে বিরোধী দল তীব্র সমালোচনা করছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নির্বাচনের প্রশ্নে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে জনগণের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতে বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মনে করে। তারপরও ভারতের চলমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে ভারতের বিচার বিভাগ সবসময়ই তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছে। যেসব রাজ্যে তাদের অনুগতরা ক্ষমতায় আছেন সেসব জায়গায় নতুন আইন সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে সংখ্যালঘুদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থা এক দারুণ সংকটের মুখে পড়েছে।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত