বরকলের দুর্গম গ্রামে ৫ জনের মৃত্যু যেভাবে

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৪, ০১:৩৯ এএম

রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের চান্দবী ঘাট গ্রামে গত আড়াই মাসে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে একজনের জ¦র আর অন্যজনের রক্তবমিতে মৃত্যু হয়। বাকিরা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক), বুকে ব্যথা ও কিডনি রোগসহ নানা অসুখে ভুগে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মেডিকেল টিমের প্রধান এবং বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মংক্যছিং সাগর।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চান্দবী গ্রামে পৌঁছে রোগীদের চিকিৎসার কাজে নেমে পড়ি। শুরুতে যারা জ্বর, পেটব্যথা নিয়ে অসুস্থ ছিল, তাদের চিকিৎসা শুরু করি। তাদের শারীরিক বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে বুঝতে পারি এটা সিজনাল জ্বর ছিল। তবে স্থানীয় কবিরাজ তাদের ভয় দেখিয়ে স্বাভাবিক খাবার বন্ধ করে দেন। তাদের ভাত আর বেগুন ছাড়া অন্য খাবার দেওয়া হয়নি। এতে রোগীরা আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। কবিরাজের নিষেধ ছিল প্রচলিত যে ওষুধ কিংবা চিকিৎসা সেটা দেওয়া যাবে না, এতে বর্তমানে যারা আক্রান্ত তারা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।’

ডা. মংক্যছিং সাগর আরও বলেন, ‘গত ১৭ মার্চ সোনি চাকমা নামে ৮ বছর বয়সী যে শিশুটি মারা যায়, তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সোনি চাকমা জ্বরে আক্রান্ত ছিল। জ্বর সারাতে তারা কবিরাজের শরণাপন্ন হলে কবিরাজ তাদের বিভিন্ন শেকড়ের রস খেতে দেন। রস খাওয়ানোর ফলে শিশুটির ঘন ঘন বমি হয়, একসময় রক্তবমি হতে থাকে। এতে শিশুটি মারা যায়। এ ছাড়া বিমলেশ্বর চাকমা (৫৫) স্ট্রোক ও ডালিয়া চাকমা বুকব্যথাসহ অন্যান্য রোগে মৃত্যুবরণ করেন। বাকি দুজনের একজন প্যারালাইসিসের পাশাপাশি হাত-পা ফুলে যাওয়া ও অন্যজনের কিডনি রোগের সমস্যাসহ আগে থেকে বিভিন্ন রোগ থাকায় তারা মৃত্যুবরণ করেন।’

চান্দবী গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, গ্রামে বহু বছরের একটি পাকুড়গাছ ছিল। সেটি গত জানুয়ারি মাসে কেটে ফেলা হয়। গাছটি কাটার সপ্তাহখানেক পর বিমলেশ্বর চাকমা মারা যান। মূলত তার মৃত্যুর পর গ্রামে রটিয়ে দেওয়া হয় যে কেটে ফেলা ওই গাছে থাকা ভূত মানুষের ওপর ভর করেছে। এজন্য কেউ স্বাভাবিক জ্বরে আক্রান্ত হলেও গ্রামবাসী ভাবত তাকে ভূতে ধরেছে। কবিরাজও একই কথা বলায় মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস গাঢ় হতে থাকে, আর পরে আরও কয়েকজন মারা যাওয়ায় সবাই কবিরাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ডা. নিহার রঞ্জন নন্দী বলেন, ‘কুসংস্কারের কারণে ঘটনাটি এত বড় হয়েছে। যারা মারা গেছেন তারা আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। পাশাপাশি হালকা জ্বর আসার পর মৃত্যুবরণ করলে স্থানীয় বৈদ্য বয়সী বৃক্ষ কেটে ফেলার গল্প রটিয়ে দেন। তার পরও আমাদের মেডিকেল টিম বর্তমানে যারা জ্বরে আক্রান্ত তাদের চিকিৎসা দিয়েছেন।’ যারা আক্রান্ত তাদের জ্বর হালকা বলেও জানান সিভিল সার্জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত