হিঙা জানাই, কমরেড কুমুদিনী হাজং

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ১১:০৯ এএম

বিদ্যমান সামাজিক শ্রেণি, বর্গ, তন্ত্র, নীতি ও নথি জানা বোঝার ক্ষেত্রে খনা, বেগম রোকেয়া, ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, লীলা নাগ, চন্দ্রাবতী, তারামন বিবি, জাহানারা ইমাম, হেনা দাস, সুফিয়া কামাল, মনোরমা বসুদের অবদান ও ইতিহাস কিছুটা আলাপে উচ্চারিত হলেও গ্রামাঞ্চলের নিম্নবর্গের সহস্র নারীর প্রসঙ্গ বরাবরই আড়ালে থেকে যায়। রাশিমনি হাজং, কুমুদিনী হাজং, কাঁকেত হেনইয়তা, করুণাময়ী সর্দার, লীলাবতী সিংহ, দামিনী গোয়ালা, গীদিতা রেমা, কল্পনা চাকমা, নসিফ পথমি, সুদেষ্ণা সিনহা, ফুলমনি মুরমু, জায়েদা, বিশদমণি টপ্প কিংবা বিচিত্রা তির্কির মতো সহস্র অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এরা ঔপনিবেশিকতা, লিঙ্গবৈষম্য, সার্বভৌমত্ব, আত্মপরিচয়, ন্যায্য মজুরি, অন্যায় শাসন, কৃষি, ভূমি, অরণ্য, জাতিগত নিপীড়ন, মাতৃভাষা, যৌননিপীড়ন, যুদ্ধাপরাধ, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সমাজ রূপান্তরের প্রশ্নগুলো জারি রেখে জানবাজি লড়াই করে গেছেন। কিন্তু দেশের দুঃসাহসী এমনসব বীর নারীদের লড়াইয়ের আখ্যান ও জীবনদর্শন সমাজ কী রাষ্ট্রে নিদারুণভাবে বঞ্চিত ও দলিত। জানি ইতিহাসগ্রন্থনের প্রচলিত প্রকল্প লিঙ্গ ও জাত্যাভিমানী। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া প্রবলভাবে পুরুষালি। তাই আমাদের নিম্নবর্গের সংগ্রামী নারীরা আমাদের ‘জাতীয় প্রতীক’ হিসেবে অস্বীকৃতি থাকেন। তারপরও সেইসব নারীর বহুজন তাদের সমাজে এবং একা সংবেদনশীল নাগরিক পরিসরে ‘প্রণম্য’ এবং ‘প্রার্থনার’ প্রতীক হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘টঙ্ক আন্দোলনের’ নেতা কমরেড কুমুদিনী হাজং এমনি এক শ্রদ্ধেয় প্রণম্যজন। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলী গ্রামে বসবাসকারী টঙ্ক আন্দোলনের এই জীবন্তপুস্তক ২০২৪ সালের ২৩ মার্চ অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। চলতি আলাপখানি কমরেড কুমুদিনী হাজংকে হাজং ভাষায় ‘হিঙা জানিয়ে (সশ্রদ্ধ অভিবাদন)’ তার কর্ম ও কীর্তির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করে আবারও। একইসঙ্গে বিশ্বাস করে পাঠ ও তৎপরতার ভেতর দিয়ে জাতীয় ইতিহাসের রক্তবীজ হয়ে কুমুদিনী হাজং আমাদের জাগিয়ে রাখবেন বারবার।

টঙ্ক আন্দোলনের বিপ্লবী হিসেবে কুমুদিনীর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে কেন্দ্র করে যৌননিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আড়ালে চলে যায়। কুমুদিনী হাজংয়ের জীবন দর্শন বুঝতে হলে হাতিখেদা, টঙ্ক আন্দোলনসহ সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা জনসংগ্রামের প্রেক্ষাপট নিয়ে আমাদের কিছু বলা জরুরি। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেই মূলত বিস্তৃত হয়েছিল টঙ্ক আন্দোলনের বিদ্রোহী তরঙ্গ। মান্দি বা গারো, কোচ এবং ডালুরা এই অঞ্চলের পাহাড়ি টিলায় জুম-আবাদ করতেন। আবার হাজং, বানাই, হদি, রাজবংশীরা সমতলের লাঙ্গলভিত্তিক কৃষি আবাদ করতেন। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হলে সরকার যুদ্ধ বাহাদুরির জন্য বনের হাতি ধরতে বাধ্য করে হাজংদের। শুরু হয় ‘হাতি বেগার প্রথার’ মতো জুলুম। বনের হাতি ধরে বিক্রি করা পাপ বলে গ্রামে গ্রামে হাজংরা ফুঁসে ওঠে। সংগঠিত করে ‘হাতিখেদা বিরোধী আন্দোলন’। ব্রিটিশ সরকার নির্দয়ভাবে হাতিখেদা বিপ্লবীদের হত্যা করে। মনা হাজং, গোরাচাঁদ হাজং, সোয়া হাজং, রতি হাজং, মংলা হাজং, বেহারী হাজং, জগা হাজং, বাঘা হাজং হাতিখেদা বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে হাতিখেদা আইনত নিষিদ্ধ হয়। বনের হাতি ধরে বিক্রি করার কাজ বন্ধ হওয়াতে জমিদাররা আরও অন্য যেকোনোভাবে বেশি খাজনা আদায়ে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর জমিদারি জুলুমের, বেশি অর্থের লোভ থেকেই টঙ্কপ্রথা জারি হয়। ১৯৩৭ সালের দিকে সোয়া একরের জন্য ১৫ মণ ধান খাজনা দিতে বাধ্য করা হয় কৃষকদের।

টঙ্ক, নানকার ও তেভাগা প্রায় সমসাময়িককালে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ উপনিবেশি ও জমিদারি জুলুমের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন। টঙ্ক আন্দোলন প্রধানত চারটি প্রধানপর্বে সংগঠিত হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হয় টঙ্ক আন্দোলনের রক্তাক্ত তৃতীয় পর্ব। ১৯৪৬ সালের পয়লা জানুয়ারি তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির আয়োজনে সুসং দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে টঙ্ক আন্দোলনের নীতি ও কৌশল নিয়ে এক সমাবেশ হয়। রাশিমনি, কুমুদিনী, দিস্তামণি, ভদ্রমণি, অশ^মণি, সমাপতী, যাদুমণি, বিপুলা, মালতী, সুরূপা, ললিত, রামনাথ, পরেশচন্দ্র, বিপিন, মঙ্গল, বাসিন্ত ও নবীন হাজংরা সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। একই সালের ৩১ জানুয়ারি ঘটে টঙ্ক আন্দোলনের ইতিহাসে নিদারুণ গণহত্যা।

দেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় টঙ্ক আন্দোলনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষিত নয়। এমনকি আন্দোলনের বিপ্লবী বিদ্রোহীদের প্রতিও আছে তীব্র অবহেলা। জীবিতকালে যে কুমুদিনী প্রায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তার জীবনসংগ্রামের ইতিহাসগ্রন্থনেও আছে উদাসীনতা। এমনকি রাষ্ট্রের বিভিন্ন নথি ও দলিলে তার পরিচয় গ্রন্থিত হয়েছে নানাভাবে। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্মতারিখ দেওয়া আছে ১৩/৯/১৯৩৭। পিতার নাম লেখা হয়েছে অতীশ সরকার এবং মায়ের নাম জৌনদেবী হাজং। সরকারি তথ্য বাতায়ন ‘কুল্লাগড়া ইউনিয়নের’ ওয়েবসাইটে কুমুদিনী হাজংয়ের জন্মতারিখ নেই, বরং উল্লেখ আছে তিনি তার জন্মসন নিজে বলতে পারেন না। তথ্য বাতায়নে তার পিতার নাম অতিথ চন্দ্র রায় এবং মায়ের নাম জনুমনি হাজং লেখা হয়েছে। উইকিপিডিয়া কুমুদিনীর জন্মসাল লিখেছে আনুমানিক ১৯৩০। কুমুদিনীর মা জনুমনি হাজং ছিলেন ঐতিহ্যবাহী তাঁত বানা কারিগর, বাবা অতিথ চন্দ্র রায় একজন হাতিখেদা বিদ্রোহী। জন্মের দু’বছরের ভেতর কুমুদিনী মা-বাবাকে হারান। কুমুদিনী বড় হন মামার কাছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে মাইজপাড়ার লংকেশ্বর হাজংয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পরপর শুরু হয় টঙ্কপ্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন। লংকেশ্বর হাজং তার তিন ভাইসহ সবাই টঙ্ক আন্দোলনে যোগ দেন। একই সঙ্গে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন কুমুদিনী হাজং। টঙ্ক আন্দোলনে বহু হাজং নারী-পুরুষ শহীদ হয়েছেন। এই আন্দোলন সামগ্রিকভাবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের হাজং গ্রাম, কৃষি ও উৎপাদনব্যবস্থা, জীবিনজীবিকা আমূল পাল্টে দেয়। ১৯৫০ সালে প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে এই প্রথা রহিত হলেও হাজংদের জীবনে আজও সুরক্ষা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়নি।

টঙ্ক আন্দোলনের শত সহস্র বীরদের ভেতর কুমুদিনীর নাম কেন বহুল উচ্চারিত? টঙ্ক আন্দোলনের একটি বিশেষ সময়ে এক যৌনসহিংসতার প্রতিবাদের কারণে মূলত কুমুদিনীকে সমাজ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। ১৯৪৬ সালে ৩১ জানুয়ারি সকাল দশটার দিকে বিরিশিরি থেকে সিমসাং বা সোমেশ্বরী নদী পাড়ি দিয়ে ৪ মাইল উত্তর-পশ্চিমে বহেরাতলী গ্রামে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল লংকেশ্বর ও তার ভাইদের ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কুমুদিনীদের বাড়ি আক্রমণ করে। লংকেশ্বরকে না পেয়ে আক্রমণকারীরা কুমুদিনীকে টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সশস্ত্র বাহিনীর এই যৌনসহিংসতার বিরুদ্ধে গ্রামব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তুলেন ঐতিহাসিক টঙ্কবিপ্লবী হাজং মাতা রাশিমনি হাজং। ঐ দিনই সশস্ত্র রাইফেলসের গুলিতে শহীদ হন রাশিমনি হাজং, দিস্তামনি হাজং, বাসন্তি হাজংসহ প্রায় ১২ জন লড়াকু হাজং বীর। পরবর্তী সময়ে বহেরাতলী, হালুয়াঘাটের লক্ষীকুড়াসহ আশপাশের গ্রামে সরকারের দুঃশাসন এবং বৈষম্যমূলক টঙ্কপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেন কুমুদিনী। কমরেড মণিসিংহ, ললিত সরকারসহ কমিউনিস্ট পার্টির অনেকের সঙ্গেই আন্দোলনের এক অনন্য সংগঠক কুমুদিনী ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তার সর্বশেষ চার আড়া জমি হারান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার দিন কেটেছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা আশ্রয় শিবিরে। দেশ স্বাধীনের পর তিনি আর তার বসতভিটা ফেরত পাননি। ততদিনে বহিরাগত বাঙালি সেটেলাররা পুরো বহেরাতলী হাজং মান্দি এলাকা দখল করে ফেলে। কুমুদিনীর জায়গা হয় বন বিভাগের দেওয়া একটুকরা ছোট্ট টিলায়। তার তিন পুত্র ও দুই কন্যার ভেতর অর্জুন হাজং ও তার স্ত্রী দিনমজুর। দিনমজুরির টানাটানির সংসারে কলিজাভরা দুঃখ নিয়ে বেঁচেছিলেন আমাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সুরক্ষার সাক্ষী কুমুদিনী হাজং। টঙ্ক, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ, চীনামাটি প্রকল্প একের পর এক কুমুদিনী সাক্ষী হয়েছেন অন্যায়, বৈষম্য আর শোষণের; একইসঙ্গে এসব নিয়ে প্রশ্ন করে জানবাজি রেখে দাঁড়িয়েছেন আজীবন। টঙ্ক আন্দোলনে কুমুদিনী, লংকেশ্বর, মণিসিংহদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তারা নানা জায়গায় আশ্রয় নিতেন এবং পরিচয় বদলে আন্দোলন চাঙ্গা রাখতেন। কুমুদিনীও তার পরিচয় পাল্টে হয়েছিলেন সরস্বতী হাজং। আর তাই সুপ্রকাশ রায় ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় কৃষক ও ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ পুস্তকে কুমুদিনীর নাম ‘সরস্বতী’ বলে উল্লেখ করেছেন। কুমুদিনী হাজংকে অনন্যা শীর্ষদশ পদক ২০০৩, ড. আহমদ শরীফ স্মারক সম্মাননা ২০০৫, সিধু-কানহু-ফুলমণি পদক ২০১০, জলসিঁড়ি পদক ২০১৪, হাজং জাতীয় পুরস্কার ২০১৮, বাংলা একাডেমি সমাজসেবা ফেলোশিপ ২০১৯, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন কর্তৃক সম্মাননা ২০২১ প্রদান করা হয়েছে।

টঙ্ক আন্দোলনের সময় কুমুদিনীকে যখন তৎকালীন রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী হামলা করে তখন রাশিমণি হাজং গ্রামের সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। হাজং রাওয়ে (ভাষায়) রাশিমণি ডাক দেন, ‘ ... ময় তিমাদ, তিমৗদলৗ মান ময় রুক্ষা কুরিব না-তে মরিব, তুরা তুমলা নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক’। এর বাংলা মানে এরকম হতে পারে, ...আমি একজন নারী, নারী হয়ে নারীর মান রক্ষা করব না হয় মরব, তোমরা তোমাদের নীতি নিয়ে বসে থাকো। আজ যখন জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ থামছে না; পুলিশি হেফাজত থেকে হাসপাতাল, গ্রামের মাঠ থেকে গার্মেন্টস সর্বত্র যৌনসহিংসতা ক্রমাগত বাড়ছে এমন সময়ে আমাদের কুমুদিনী হাজংয়ের সাহসী বীক্ষা খুব জরুরি এবং রাশিমণি হাজংয়ের মতো দুর্নিবার নেতৃত্ব জরুরি।

লেখক: গবেষক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত