মশা মারার উদ্যোগ শুধুই আস্ফালন

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ১২:০৭ এএম

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। প্রাণ ফিরে পাচ্ছে মশা। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছে সারা দেশে। ডোবা, নালাগুলোতে এবং রাজধানীর ম্যানহলগুলোতে মশার কারখানা। এ কথা সবারই জানা। এসব মশার উৎসস্থল ধ্বংস করার জন্য কাজ করে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা এবং মন্ত্রণালয়। মশা বাড়লেও এসব সংস্থার মশা নিধনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। যদিও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ঈদের পর মশা নিধনের অভিযান শুরু করবেন। এ হিসাবে ধরা যেতে পারে আরও এক মাস পর মশা মারার উদ্যোগ নেবে করপোরেশন। কিন্তু তত দিনে কি মশা আমাদের কামড়াবে না? গত দুবছর ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। জনমানুষের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক রয়েছে। গত বছরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন। আর ঢাকার বাইরে ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। গত বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১ হাজার ৭০৫ জন। ঢাকায় ৯৮০ জন ও ঢাকার বাইরে ৭২৫ জন। এ হিসাব হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের। তাদের বাইরে কয়েক লাখ লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে থেকে ও চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। এর হিসাব সরকারি দপ্তরে থাকে না।

এ বছরের জানুয়ারি থেকেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ধীরে ধীরে এডিস মশার পিক সিজনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। মানে যা দাঁড়াচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত হলেও মশা নিধনকারী সংস্থাগুলো মানুষকে যেন হাসপাতালে যেতে না হয় তার ব্যবস্থা করছে না।

সম্প্রতি মশা নিধনে খাল (লেক) পরিষ্কার কর্মসূচি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজউকের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞাসহ ঢাকা উত্তর সিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠান চলাকালীন মন্ত্রী, মেয়র, অন্য অতিথিসহ উপস্থিত সবাই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি লাইভ ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ওই ভিডিওতে মন্ত্রী, মেয়রসহ অন্যদের হাত দিয়ে মশা তাড়াতে দেখা যায়। মশার কামড় নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে একজন রসিক সাংবাদিক মন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আজকে আপনি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন মশার কী অবস্থা, আপনারাই বসতে পারছেন না। চিন্তা করে দেখেন, মশা নিয়ে ঢাকার মানুষ কত দুর্ভোগের মধ্যে আছে। মশাকে কী আপনার কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হয় না?’ এর উত্তরে মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাই এডিস নিয়ে বেশি আতঙ্কিত। কারণ, এডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা মারা যান। সে ক্ষেত্রে বছরের প্রথম থেকে এ নিয়ে বলেছি।’

অনুষ্ঠানে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘এডিস মশার জন্য যার যার ঘর, অফিস-আদালত তাকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমার কাছে কিন্তু অসম্ভব, কারও বাড়ির ছাদে পানি জমে আছে কি না, তা দেখা। এডিস মশার জন্য সবাইকে সামাজিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন হট স্পটগুলোয় চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এডিস মশা থেকে বাঁচার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাড়ায়, মসজিদে, মন্দিরে, চার্চে আলাপ করতে হবে যার যার এলাকা পরিষ্কার করা জন্য।’

যদি তাই হয় তবে সিটি করপোরেশন মশা নিধনে বাজেট নেয় কেন? ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মশা মারার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, পরে সেটা বেড়ে ৫৮ কোটিতে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসিতে মশা মারতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মশা নিধনের খরচ অনেক বাড়লেও এ কাজে সফলতা দেখাতে পারেনি ডিএনসিসি। একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও। সেখানে প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে।

আসলে মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা অনেকটাই স্পষ্ট। গত দুবছর ধরে এডিস মশার উৎপাত থাকলেও মশা নিধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যে কীটতত্ত্ববিদরা তাদেরই সংকট রয়েছে সিটি করপোরেশনে। কারণ কীটতত্ত্ববিদরা শহরের কোথায় মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়েছে এবং সেখানে মশা নিধনে কী কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার তা নিয়মিত ইনস্পেকশন করে প্রতিবেদন দেন করপোরেশনের কাছে। তার ওপর ভিত্তি করেই করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা থাকলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। ফলে মশার প্রজননক্ষেত্র বা উৎপত্তিস্থল অজানা থেকে যায়। যদিও আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে নানা গবেষণা এবং বছর জুড়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হলেও তাদের কাছ থেকে মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণের বিদ্যা গ্রহণ করিনি আমরা।

রাজধানীর মশা নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে শুধু ঢাকাতেই মশা বেড়েছে দ্বিগুণ। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মশা রয়েছে রাজধানীর উত্তরা ও দক্ষিণখানে। শীত শেষে নেই জমে থাকা পানি, তারপরও মশার বিস্তার থেমে নেই। অন্যদিকে বছরে মশা মারার পেছনে ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোন। পানিতে ছাড়া হয়েছে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ। কিন্তু এত কিছুর পরও মশা না কমে কেন বেড়েছে, এর কোনো উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছেও নেই। এ ছাড়া এর আগে মশা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ভেজাল কোম্পানির কাছ থেকে কীটনাশক ‘বিটিআই’ আমদানি করায় ওই সিটির মশা মারার উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এ বছর সরাসরি বিটিআই আমদানির কথা ভাবছে উত্তর সিটি করপোরেশন। যদিও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া উদ্যোগ নিলে মশা কখনোই কমবে না। তা ছাড়া কিউলেক্স আর এডিস মশা নিধনে নিতে হবে আলাদা উদ্যোগ। সেটা না হয় হবে। সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এবং মানুষ সচেতন না হলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। কিন্তু সরকার বা সিটি করপোরেশনসহ সংস্থাগুলোকে তো পদক্ষেপগুলো দেখাতে হবে। মানুষকে মশার উৎসস্থল ধ্বংসে উৎসাহিত করতে হবে।

সংকট আছে সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও রাজউক এবং ওয়াসার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব খুবই স্পষ্ট। সিটি করপোরেশনের অভিযোগ খাল ও জলাশয়গুলোতে অনেক মশা জন্ম নেয়। এসব খালের নিয়ন্ত্রণ রাজউক, ওয়াসাসহ বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের কাছে থাকায় সেগুলো অপরিচ্ছন্ন থাকে। উত্তর সিটির মেয়রও ওয়াসা এবং রাজউককে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডোবা খাল পরিষ্কার করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তারা সেভাবে সাড়া দেয় না বলে মশা অনেক বৃদ্ধি পায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, দক্ষিণখান ও সাভারের কয়েকটি জায়গায় মোট ১২টি ফাঁদ পাতেন। প্রতি ২৪ ঘণ্টা পরপর ফাঁদের মশা পরীক্ষা করেন এই দলটি। ফাঁদে জমা মশা নিয়ে দলটি গত পাঁচ মাসের একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, এই ফাঁদগুলোতে গত বছরের নভেম্বর মাসে গড়ে প্রতিদিন ২০০টি করে, ডিসেম্বরে ২২৩টি, জানুয়ারিতে ৩০০টি, ফেব্রুয়ারি ৩৩৮ এবং মার্চে ৪২০টি করে মশা ধরা পড়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে ঢাকায় মশা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। সব ফাঁদে আটকা পড়া মশার গড় সংখ্যা ৪২০টি হলেও উত্তরা এবং দক্ষিণখানের চারটি ফাঁদে দৈনিক ধরা পড়ে গড়ে ৬০০টি মশা। আর ফাঁদে যেসব মশা আটকা পড়েছে তার মধ্যে ৯৯ ভাগই ছিল কিউলেক্স মশা।

মশার উৎপত্তিস্থল ও মশার প্রাদুর্ভাব পর্যালোচনার জন্য এ ধরনের গবেষণাও কার্যকর। যা থেকে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে এই গবেষণার ফল গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। কারণ এডিস মশার প্রাদুর্ভাব থাকলে সিটি করপোরেশন কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ গ্রহণ করে না। এতে শুধু হম্বিতম্বিতেই থাকছে মশার মারার উদ্যোগ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত