অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ফারুক আহমেদ এবং আতাহার আলী খান, দুজনেই অল্পের জন্য বঞ্চিত হয়েছেন টেস্ট ক্যাপ থেকে। ফারুক ১৯৯৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর আর জাতীয় দলে খেলেননি, আতাহারও সবশেষ খেলেছেন ১৯৯৮ সালে। টেস্টের জন্মলগ্ন থেকেই পাঁচদিনের ক্রিকেটের প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উদাসীনতা এবং তারুণ্যনির্ভরতার নামে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ছেঁটে ফেলার সংস্কৃতি এখনো চলমান। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপে সাবেক দুই ক্রিকেটার জানালেন টেস্টে ভালো করতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির কাঠামোতে। তাহলেই সেরা খেলোয়াড়রা খেলবেন টেস্টে।
দেশের সবশেষ দুটো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হচ্ছে ২০২৩ সালের জাতীয় ক্রিকেট লিগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ। নাঈম ইসলাম জাতীয় লিগে ৪৫৩ রান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক আর বিসিএলে ৪ ইনিংসে ২৪৪ রান করে সর্বোচ্চ। অথচ জাতীয় দলের ধারেকাছেও নেই নাঈম। এই সংস্কৃতিটাকেই খারাপ বলেছেন সাবেক নির্বাচক ফারুক, ‘নাঈম ইসলাম দুইটা আসরে বড় রান করেছে, তাকে সুযোগ দেওয়া হলো না। আগে তুষার ইমরানও অনেক রান করেছিল, সে তো বছর দুয়েক আগ পর্যন্তও খেলেছে। তাকে না হয় সুযোগ দেওয়া হয়নি বয়সের কারণে, এটা বোঝা যায়। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই কাউকে সুযোগ না দিয়ে তরুণ কাউকে সুযোগ দেওয়া যে অন্তত ১০-১৫ বছর জাতীয় দলে খেলতে পারে। এদের সুযোগ না দেওয়াটায় যেটা হয়, প্রভাব পড়ে তরুণ ক্রিকেটারদের ওপর। তারা মনে করে জাতীয় দলে খেলা, এত অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও যদি রান করে ডাক না পায় তাহলে তাদের কী হবে? ক্রিকেটাররা মনে করে জাতীয় লিগে পারফর্ম করার চেয়ে ঢাকা লিগে মোহামেডান বা আবাহনীর হয়ে একটা ৫০ বা ১০০ করলেই জাতীয় দলে ডাক পাওয়া সম্ভব। এই সংস্কৃতিটাই খুব খারাপ।’
বর্তমান নির্বাচক কমিটির আগের কমিটি এই দোষে চরমভাবে আক্রান্ত। এনামুল হক বিজয় ঢাকা লিগে আবাহনীর হয়ে রেকর্ড রান করার পর তাকে ইয়াসির রাব্বির বিকল্প হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল টেস্ট খেলতে। মাত্র ২৪টা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা টি-টোয়েন্টি ওপেনার নাঈম শেখের মাথাতেও পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল টেস্টের টুপি। ক্রাইস্টচার্চে ২০২২ সালে খেলা সেই টেস্টটিই এখন পর্যন্ত নাঈমের একমাত্র টেস্ট। টেস্টের চুক্তিতে তাকে না রেখে নির্বাচকরাও আভাস দিয়েছেন অভিষেক ইনিংসেই ০ করা এই বামহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তাদের বিবেচনায় নেই।
বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পেছনে যে অবকাঠামোগত যোগ্যতা সংস্কৃতির বদলে ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ কাজ করেছে সেটা তো প্রায় সবারই জানা। আইসিসির সাবেক প্রেসিডেন্ট এহসান মানি, দ্য টেলিগ্রাফের ক্রিকেট লেখক সিড বেরিসহ অনেকেই এই প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে ২০০০ সালে বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা দেওয়ার ১৭ বছর পর লন্ডনে আইসিসির বৈঠকে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডকে টেস্ট মর্যাদা দেওয়া হয়। ফারুক আহমেদ জানালেন, টেস্ট সংস্করণকে অবজ্ঞার ব্যাপারটা মুখে না বললেও দেশের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারকদের আচরণে স্পষ্ট, ‘আমাদের কোনো টেস্ট সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দায়সারাভাবে জাতীয় লিগ আয়োজন করা হয়, এখনো বিভাগীয় দলগুলোর কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ঢাকায় বসে দল বানিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয় লিগে টাকাও কম, ভ্রমণ ভাতা কম ও মানসম্পন্ন হোটেলেও রাখা হয় না। ঢাকা লিগে এখন একজন শীর্ষ ঘরোয়া ক্রিকেটার হেসেখেলে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পায়। জাতীয় লিগে কত পায়? এক লাখ টাকাও তো পায় না। ভালো হোটেল, দৈনিক ভাতা এসবও কম। একজন যদি বিপিএলে ৪০ লাখ আর ঢাকা লিগে ৪০-৫০ লাখ টাকা পায়, সে কেন ৫০-৬০ হাজার টাকার জন্য চারদিনের ম্যাচে খেলবে। টেস্টের ম্যাচ ফি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় লিগের ম্যাচ ফি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করলে টেস্টে আমাদের সহসা উন্নতি হবে না।’
ফারুক মনে করেন, টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির প্রথম ১০ বছরে এসব ঠিক করে ফেলা দরকার ছিল, ২৪ বছরে বড্ড দেরি হয়ে গেছে, ‘এই ব্যাপারগুলো টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির প্রথম ৮-১০ বছরে ঠিক করে ফেলা দরকার ছিল। এখন তো খেলোয়াড়দের সামনে অনেক সুযোগ। দেশে, দেশের বাইরে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলার প্রলোভন আছে। একটা হচ্ছে নেশা একটা হচ্ছে পেশা। একজন পেশাদার ক্রিকেটার তো চাইবেই ক্রিকেট খেলে একটা ডিসেন্ট লাইফস্টাইল লিড করতে, খেলোয়াড়ি জীবন শেষে সমাজে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে।’
ধারাভাষ্যকার হিসেবে অনেক দেশেই গিয়েছেন আতহার আলি খান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বললেন, ‘ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া বাদে সব দেশেই টেস্টের জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব কমছে। অ্যাশেজের মতো মহা লড়াই নেই যেসব সিরিজে, সেসব নিয়ে মানুষের আগ্রহ কম। সকালে আসতে হয়, কাজ থাকে, দায়িত্ব থাকে। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টির যেমন বিশ্বকাপ আছে, একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর হয়, টেস্টে সেরকম কিছু নেই। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ থাকলেও সেটা দীর্ঘমেয়াদি আর বাংলাদেশ বছরে হয়তো ৪টা-৬টা মাত্র টেস্ট খেলে, এই কারণেই টেস্টে বিনিয়োগ ও মনোযোগ কম।’
২৪ বছরে বাংলাদেশ খেলেছে ১৪১টা টেস্ট, হেরেছে ১০৪টিতে। ড্র করেছে ১৮ ম্যাচে যার বেশিরভাগই বৃষ্টির কৃপায়। নানান অজুহাতে শীর্ষ ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলতে চান না। সাকিব আল হাসান টেস্ট দলে ফিরলেন প্রায় ১ বছর পর, লিটন সদ্যোজাত কন্যার পাশে থাকতে দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে খেলেননি। সাকিব ও তামিম ইকবাল, ২০২২ সালে দীর্ঘ কোয়ারেন্টিনের ভয়ে নিউজিল্যান্ডে যাননি। তাসকিন আহমেদ এবং মোস্তাফিজুর রহমানও টেস্ট খেলতে চান না। অথচ বাংলাদেশের ক্রিকেটের টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির আগে আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ছিটকে পড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের অনেক কিংবদন্তীরই আক্ষেপ, অল্পের জন্য খেলা হয়নি টেস্ট ক্রিকেট। গত ২৪ বছরে যে ১০৩ জন বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট অভিষেক করেছেন, তাদের অনেকের চাইতেই হয়তো ভালোই করতেন তারা। অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য না দিয়ে ক্লাব রাজনীতির ভিত্তিতে দল গড়ার যে সংস্কৃতি, এখনো সেই খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ, এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
