মনুষ্যসৃষ্ট সব ধরনের দূষণের কারণ অর্থনৈতিক। এর সমাধান রয়েছে অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে। বিশ্ব মিডিয়ায় কিছুদিন পরপরই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের একসময়ের প্রাণের তিলোত্তমা নগরী ঢাকা, বায়ুদূষণে এখন দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ দূষিত শহরের নাম লিখিয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে কয়টি রাজনৈতিক দলের, কী ধরনের কর্মসূচি রয়েছে, তা আমরা কম-বেশি জানি। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোন ধরনের শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা হয়তো অনেকেই জানি না। কিন্তু যারা জানেন, তাদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এই যে বছরের পর বছর মানুষ দূষিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে, জীবনযাপন করছে, সে বিষয়েও কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আমাদের কী ধরনের করুণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কেবলমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ উদ্বেগজনক দূষণ ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দরিদ্র, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, বয়স্ক ও নারী জনগোষ্ঠীর। মারাত্মক দূষণে বছরে অকালমৃত্যু ঘটছে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষের জানা গেল দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে। শুক্রবার প্রকাশিত ‘দূষণে বছরে পৌনে ৩ লাখ মৃত্যু’ প্রতিবেদনে আরও জানা যাচ্ছে, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, নিম্নমানের স্যানিটেশন ও হাইজিন এবং সিসাদূষণে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু ঘটে। ফলে বছরে ৫২০ কোটি ‘অসুস্থতার দিন’ অতিবাহিত হয়। সংস্থাটি বলছে, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। ঘরের ও বাইরের বায়ুদূষণ স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলায় ৫৫ শতাংশ অকালমৃত্যু ঘটেছে। এই ক্ষতির পরিমাণ ২০১৯ সালের জিডিপির ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের সমান।
দূষণ বাড়লে তা মানুষ ও জীববৈচিত্র্য বা প্রাণিজগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, সেটাই স্বাভাবিক। বায়ু, মাটি, পানি ইত্যাদি দূষণ পরিবেশ, শ্বাস-প্রশ্বাস, খাদ্য এবং সবশেষে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ফলে আমরাই ডেকে আনছি নানা রোগব্যাধি। ভৌগোলিক কারণে প্রতি বছর শীতের সময় ঢাকার বায়ুদূষণ বাড়লেও এবার গ্রীষ্মকালেই রাজধানীর বাতাসে দূষণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। পরিবেশদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে যত মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক এবং পরোক্ষভাবে এই কারণে কত লোক মারা যায়, তার কিন্তু হিসাব নেই। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। এখন ৭২ বছরের বেশি। কিন্তু এই জীবনে একজন মানুষ কত বছর অসুস্থ থাকে, তাতে তার যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এর মূল্য কত? অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার খরচ কত? পুরো দেশের কথা বাদ। কয়েক বছর আগে শুধু ঢাকার বাতাসের মান নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত ‘হেলথ অ্যালার্ট’ জারির সুপারিশ করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তার সর্বশেষ খবর আমরা জানি না। অনেকেই বলেন, ‘উন্নয়ন’ ও ‘পরিবেশ রক্ষা’ দুটি বিপরীত শব্দ। উন্নয়ন করতে গেলে পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আমাদের প্রধান কর্তব্য।
পৃথিবীব্যাপী এখন দূষণকে দেখা হচ্ছে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে। জলাভূমি দখল ও বিপজ্জনক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে পরিবেশের অবনতি হচ্ছে। ফলে নারী, শিশু এবং দরিদ্রদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। শহরাঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই দরিদ্র জনগোষ্ঠী, তারা আবার সিসাদূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ুমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের বাজেটে জলবায়ু খাতে বরাদ্দ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এ দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা চিহ্নিত করা কঠিন। চিহ্নিত সমস্যার জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করা খুব কঠিন। সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পদের বিভাজন রোধে সব উন্নয়ন সহযোগীর এক প্ল্যাটফর্মে আসা উচিত।’
পরিবেশদূষণের হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সচেতন হতে হবে। কারণ পরিবেশের ক্ষতি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তা টেকসই হয় না। রাষ্ট্রীয় আইন মেনে শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। বনায়নের পরিমাণ বাড়াতে হবে। আসলে দূষণে বিপর্যয় রোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।
