বড় যুদ্ধের ভয়ে সতর্ক ইউরোপ

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ১২:২১ এএম

ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পোল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, যুদ্ধপূর্ব একটি পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করেছে ইউরোপ। কিন্তু এ নিয়ে ইউরোপের কোনো প্রস্তুতি নেই। রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন পরাজিত হলে ইউরোপের কোনো দেশই আর নিরাপদ থাকতে পারবে না। ইউক্রেনে রাশিয়া নতুন করে কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইউরোপের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ডোনাল্ড টাস্কের এই সতর্কতা নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে তখনই জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজারও দিলেন নতুন সতর্কবার্তা। তিনি বললেন, জার্মান জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য সাইবার আক্রমণ, প্রচারণা এবং অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করছে রাশিয়া। এইসব বিপদ একটি নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে। এটা আসলে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ পরিস্থিতি।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রনে হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। গত শুক্রবার রাতেও রাশিয়া অসংখ্য ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনে। হামলায় দেশটির পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব দিকের ছয়টি অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাপক পরিসরে রাশিয়ার এই হামলার দিনই ইউরোপের দরজায় যুদ্ধ কড়া নাড়ছে বলে সতর্ক করলেন পোলিশ প্রধানমন্ত্রী। ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, আমি কাউকে ভয় দেখাতে চাই না। কিন্তু যুদ্ধ এখন আর অতীতের কোনো ধারণা নয়। যুদ্ধ এখন বাস্তব যা শুরু হয়েছে দুই বছর আগে। তিনি বলেন, সম্প্রতি মস্কোয় সন্ত্রাসী হামলার দায় কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইউক্রেনের ওপর চাপিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। এর ন্যায্যতা দিতে ইউক্রেনে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা জোরদার করাটা তার জন্য জরুরি। এ সপ্তাহের শুরুতে রাশিয়ার প্রথমবারের মতো কিয়েভে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছুটতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর বিষয়টিও উল্লেখ করেন পোলিশ প্রধানমন্ত্রী।

গত বছর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হওয়া ডোনাল্ড টাস্ক এমাসের শুরুর দিকেও মধ্য-ডান ইউরোপীয় নেতাদের যুদ্ধ নিয়ে এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। টাস্ক ইউক্রেনের জন্য আশু সামরিক সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামী দুই বছর ইউক্রেনে কী হয়, তার ওপর ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখনই ইউরোপ সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, ইউরোপ দুর্বল হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রকে সেভাবে পাশে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো যদি সামরিক দিক থেকে আরও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে তাহলে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেন অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনিই নির্বাচিত হন না কেন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের আরও ভালো মিত্র হয়ে উঠবে।

এদিকে ডোনাল্ড টাস্কের এমন মন্তব্যের পরপরই জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজার রাশিয়ার নতুন কর্মকৌশল ও পদক্ষেপ নিয়ে সতর্ক করলেন তার দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের। তার ভাষ্য, জার্মানির জনমতকে প্রভাবিত করতে নতুন করে প্রচেষ্টায় রত মস্কো। এই পরিস্থিতিকে ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, জার্মান জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য সাইবার আক্রমণ, প্রচারণা এবং অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করছে রাশিয়া। ন্যান্সি ফেজার জুডডয়চে সাইটুং পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এইসব বিপদ একটি নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে।

দেশটির আরেক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বলছে, আগামী জুনে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং সেপ্টেম্বরে তিনটি আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জার্মানি। ভোটের আগে রাশিয়া ক্রেমলিনপন্থি দলগুলোর সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। এমন সময়েই হাইব্রিড যুদ্ধ নিয়ে আলোচনটি সামনে আনলেন জার্মান মন্ত্রী। 

ডয়েচে ভেলে বলছে, ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ শব্দবন্ধটি একটি জটিল কৌশল বোঝায়। সামরিক কৌশলের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং প্রোপাগান্ডাও রয়েছে এর মধ্যে। এটি অবশ্য নতুন কোনো কৌশল নয়। বহু শতাব্দী ধরে বিদেশে জনমত প্রভাবিত করতে এই ধরনের নানা উপায় ব্যবহার করে আসছে বিভিন্ন দেশ। কিন্তু গত দুই দশক ধরে, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের উত্থানের ফলে এই হাইব্রিড যুদ্ধ এখন অনলাইনেও জায়গা করে নিয়েছে। ‘হ্যাক-অ্যান্ড-লিক’ অপারেশনের অংশ হিসেবে হ্যাকাররা সংবেদনশীল বা গোপনীয় তথ্য চুরি করে কৌশলে সেটা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করে। নির্বাচনে ব্যবহৃত যন্ত্র এবং সফটওয়্যার হ্যাক করতেও সাইবার আক্রমণ করা হয়। পাশাপাশি বানোয়াট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, জার্মানি বেশ কিছুদিন ধরেই রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে প্রভাব বিস্তারের মূল লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সমর্থন হ্রাস করা।

মস্কোতে জার্মানির সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং জার্মানির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি-এর সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট রুডিগার ফন ফ্রিটশ বলেছেন, এখন দৃঢ় সংকল্প এবং শক্তি দেখানো এবং অন্যপক্ষ কীভাবে কাজ করছে তা প্রকাশ করার সময়। তার ভাষ্য, এখন গোয়েন্দাদের জন্য ডিজিটাল বিশ্ব স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

হাইব্রিড যুদ্ধকে অনেকে ‘ছায়া যুদ্ধ’ এর একটি রূপ হিসেবে বর্ণনা করেন। এই যুদ্ধ জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে ঘটে এবং কখনই এই যুদ্ধের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় না। হামবুর্গ-ভিত্তিক ক্যোরবার ফাউন্ডেশনের রাশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লেসলি শুবেল বলেন, হাইব্রিড যুদ্ধের ধারণাটি হচ্ছে, এটি যে ঘটছে তা আপনি খেয়ালই করবেন না।

জানুয়ারিতে জার্মান সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি সমন্বিত রাশিয়ান প্রোপাগান্ডামূলক কর্মকাণ্ড উন্মোচন করার কথা জানিয়েছিল। সেই বিষয়টি টেনে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে জার্মান সমাজে বিভাজন ও ক্ষোভ সৃষ্টি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করা।

শুবেল বলেন, সন্দেহ তৈরি করতে এরই মধ্যে সফল হয়েছে রাশিয়া। মার্চের শুরুতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকারী আরটি জার্মান সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গোপন কথোপকথন প্রকাশ করে। ‘টরাস লিক’ নামে পরিচিত এই কথোপকথন জার্মান সামরিক বাহিনীকে বেশ বিব্রত করে এবং এ নিয়ে একটি কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি হয়। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে জার্মান সামরিক কর্মকর্তাদের ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক করতে শোনা গেছে। রুশ মিডিয়া এরপর দাবি করেছে যে জার্মানির সেনাবাহিনী রাশিয়ান অঞ্চলে আক্রমণ করার জন্য পরিকল্পনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টরাস লিক থেকে বোঝা গেছে যে সমাজের সকল ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি কতটা প্রয়োজনীয়। নাগরিকদের বিভ্রান্তিমূলক কৌশল সম্পর্কে সচেতন করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত