নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্প-বাইডেন স্নায়ুযুদ্ধ

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪২ এএম

আমেরিকার নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো সুপার টুয়েসডে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দলীয় প্রাথমিক বাছাইপ্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম এই দিনটি শেষে- প্রাইমারি নির্বাচনে রিপাবলিকান দল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এগিয়ে রয়েছেন। এটি নিশ্চিত যে আগামী নভেম্বরে ২০২০ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ এবারও সেই বাইডেন ও  ট্রাম্পের মধ্যে লড়াই হতে যাচ্ছে। নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বিদায় হওয়ার পর ২০২৪ সালের নির্বাচনের মাঠে আবারও তার ফিরে আসার ঘটনা মার্কিন গণতন্ত্র ও সাম্রাজ্যের দৈন্যদশাকেই তুলে ধরছে।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কংগ্রেসে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণ দিয়েছেন। তিনি যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আমেরিকানদের পাশাপাশি আমেরিকান নির্বাচনের বিষয়ে ক্রমে নার্ভাস হয়ে পড়তে থাকা বিশ্ব স্টেট অব ইউনিয়ন-এর বদলে বাইডেনের অবস্থাকে মূল্যায়নের বিষয়ে বেশি মনোযোগী ছিল। ইতিমধ্যে বাইডেনের বার্ধক্যজনিত সমস্যা নিয়ে খোঁচা দিয়ে ট্রাম্পের বক্তৃতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হাজার হাজার মিমের কারণে বাইডেন বয়সের ভারে কথাবার্তায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারা ব্যক্তি হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তৃতা এবং সেসব মিমের ভাষ্য যে ঠিক নয়, তা বাইডেনকেই প্রমাণ করতে হবে। এক ঘণ্টার বেশি সময়ের এই লড়াকু বক্তব্যে বাইডেন সেই বাধা বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছেন। ভাষণে তিনি বেশ চড়া স্বরে বিরোধীদের আক্রমণ করেছেন। তিনি রিপাবলিকান শিবিরকে কথার তীরে বিদ্ধ করেছেন। এর আগে বক্তব্য দেওয়ার সময় বাইডেন জীবিত ও মৃত ব্যক্তিকে গুলিয়ে ফেলায় ফক্স নিউজ তাকে টলটলায়মান মাতাল ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছিল এবং তারা তাকে ‘জ্যান্ত লাশ’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছিল। তবে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণটি সে ধরনের বার্ধক্যজনিত ভারসাম্য হারানো কথা বা মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া থেকে মুক্ত থাকায় ইতিমধ্যে পণ্ডিতরা বাইডেনের ভাষণকে সাহসী এবং অসাধারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গণমাধ্যমে জো বাইডেনকে সাহসী হিসেবে দেখানোটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য খুব জরুরি ছিল। কারণ, আগামী আট মাস তাকে যে কঠিন পথ অতিক্রম করতে হবে, সেই পথে চড়াই-উতরাই বাড়তেই থাকবে।

গত সপ্তাহেই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ট্রাম্প কেবল তার সমর্থকদের মনোনীত প্রার্থী নন। তিনি সুপার টুয়েসডের প্রাইমারিতে তার সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বী নিকি হ্যালিকে একটি ছাড়া সব ক্ষেত্রেই পরাস্ত করেছেন এবং হ্যালিকে নির্বাচনী দৌড় থেকে বের করে দিয়েছেন। কংগ্রেসে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে যারা একসময় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন, তারাও এখন মাথা নোয়াতে বাধ্য হচ্ছেন। বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককোনেলের তাইওয়ান বংশোদ্ভূত স্ত্রীকে নিয়ে ট্রাম্প চরম বর্ণবাদী মন্তব্য করার জের ধরে তিন বছর উভয়ের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সেই ম্যাককোনেলও ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন। সীমান্ত চুক্তি নিয়ে রিপাবলিকান দলের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের একটি আপসরফাভিত্তিক চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। রিপাবলিকান নেতারা সেই চুক্তির প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছেন। এর কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে অভিবাসন ইস্যুতে বাইডেনকে আক্রমণ করতে পারবেন। অনেকে আশা করেছিলেন, প্রাইমারির মৌসুমে রিপাবলিকানদের মধ্যে থাকা ট্রাম্পবিরোধীরা একটি বড় ভূমিকা রাখবেন এবং প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান তারা দুর্বল করে দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই তত্ত্ব আর কাজ করেনি। অনেকে আশা করেছিলেন, ট্রাম্পকে দুর্বল করে ফেলবে তার বিরুদ্ধে হওয়া ৯১টি ফৌজদারি মামলা। এমনকি, দুটি অঙ্গরাজ্য বিচারকরা ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় স্পষ্টই ট্রাম্পকে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে দাঁড়ানোর অযোগ্য প্রতিপন্ন করেছিলেন। কিন্তু  সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে কলোরাডোর আদালতের দেওয়া রায় খারিজ করে দেয় এবং ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই ট্রাম্প দাঁড়াতে পারবেন বলে চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টে তিনজন চরম ডানপন্থি বিচারক নিয়োগ করে গিয়েছিলেন। সেই নিয়োগের বদৌলতে সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পপন্থি বিচারকদের প্রাধান্য রয়েছে। সেই আদালত সম্প্রতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে করা মামলাটির কার্যক্রমকে কার্যকরভাবে ধীরগতির করে দিয়েছে। মামলায় অভিযোগ- ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল ট্রাম্প উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই মামলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনের আগে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে, এমন আশা ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধি ডেমোক্র্যাট শিবিরকে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। গত মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মস্কোর মধ্যে একধরনের আঁতাত তৈরি হয়েছিল বলে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুয়েলারের তদন্তে তথ্য উঠে আসার পর থেকে ডেমোক্র্যাটরা আশা করে এসেছেন, বিচারিক কর্র্তৃপক্ষ ট্রাম্প সমস্যার সমাধান করে দেবে। তবে বারবার ডেমোক্র্যাটদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। যদি তারা ট্রাম্পকে পরাজিত করতে চান, তাহলে তাদের অবশ্যই সেটা করতে হবে, যা তারা ২০২০ সালে করেছিলেন। অর্থাৎ ভোট দিয়ে তাদের ট্রাম্পকে পরাজিত করতে হবে।

জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনামেই শুধু ট্রাম্প এগিয়ে থাকছেন না। বরং তিনি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়, এমন বিভিন্ন রাজ্যে জনপ্রিয়তায় বেশ এগিয়ে গেছেন। গত নির্বাচনে বাইডেনের জয়ের পেছনে যে ভোটিং গ্রুপগুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, সেই গ্রুপগুলোর মধ্যেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ও হিসপানিক ভোটারদের ভেতরেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমে বাড়ছে। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ যে ভোটাররা গতবার ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তারা তাদের সেই সমর্থনের জায়গা থেকে সরে আসেননি। ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার কথা হচ্ছে, তরুণ ভোটারদের অনেকেই পক্ষত্যাগ করছেন। ২০২০ সালের ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে ২৫ পয়েন্ট পেয়েছিলেন বাইডেন। কিন্তু এবার সেই সংখ্যা প্রায় সমান সমান হয়ে এসেছে। তাছাড়াও গাজা থেকে প্রতিদিন ভয়ংকর সব চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। এরপরও ইসরায়েলের প্রতি বাইডেনের সমর্থন তরুণ ভোটারদের উত্তরোত্তর বিক্ষুব্ধ করছে। বিশেষ করে মিশিগানের মতো আরব আমেরিকান সুইং ভোটার অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে বাইডেনের জনসমর্থন অনেক কমে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইনি ঝামেলা দিন দিন যতই বাড়তে থাকুক না কেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। গত এপ্রিলে যখন প্রথমবারের মতো অভিযুক্ত হলেন তার পর থেকে বস্তুত তার পক্ষে সমর্থন বেড়েছে। যদিও ট্রাম্পই হলেন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়া প্রথম সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়া ও আদালতে হাজিরা দেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পই পরিণত হয়েছেন রিপাবলিকান ভোটারদের প্রথম পছন্দে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সমর্থকদের মধ্যে যে একাত্মতাবোধ তা ভাঙা কঠিন হবে। ট্রাম্প সমর্থকরা বলছেন, তারা ট্রাম্পের চোখ দিয়েই দুনিয়াকে দেখে। তারা বিশ্বাস করে ট্রাম্পের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আপাতত যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, ট্রাম্প জনসমর্থনের দিক থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়ে কিছুটা এগিয়েই আছেন। দ্য ইকোনমিস্টের সর্বশেষ জরিপ বলছে, এখন ৪৬ শতাংশ জনমত ট্রাম্পের পক্ষে। আর বাইডেনকে চান ৪৪ শতাংশ মার্কিনি।

ওদিকে বাইডেনের ফিটনেস নিয়ে আলোচনা গড়িয়েছে অনেক। সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে যাওয়া কিংবা বিমানে উঠতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার ঘটনাগুলো খুব একটা ভালো ধারণা দেয় না তার শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপারে। বিপাকে আছেন স্মৃতিবিভ্রমের ঘটনায়। কয়েকবার গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় ভুলে গেছেন বা ভুল বলেছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট হার অতি গোপনীয় নথি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বাইডেনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তার তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু কঠোর সমালোচনাও রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে প্রেসিডেন্টের স্মৃতিশক্তিতে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাইডেন বলেছেন, বয়স সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৭৭ বছর বয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ৮১ বছর বয়সী জো বাইডেন কতটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবেন সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত