পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই দুই যুগ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৬ এএম

টেস্ট ক্রিকেটে দুই যুগে পা রেখেছে বাংলাদেশ। সাদা চোখে দেখলে দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সাদাপোশাকের পুরোটাই ব্যর্থতার কালো চাঁদরে ঢাকা। আরও গভীরভাবে দেখলে, পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই পার হয়েছে দীর্ঘ সময়টা। ক্রিকেটের এই কুলীন পরিবারে অভিষেকের দুই যুগ পূর্ণ হবে আগামী নভেম্বরে। এই সময়ের ১৪২ টেস্টে মর্যাদার ক্যাপ পরানো হয়েছে ১০৪ জনকে। প্রায় প্রতিটি ম্যাচ অথবা সিরিজে টেস্টে নতুন ক্রিকেটার খেলিয়েছে বাংলাদেশ। যাদের অনেকেই মিলিয়ে গেছেন কালের গহ্বরে।

২৪ বছর টেস্টের জন্য খুব বেশি সময় না হলেও একেবারে কমও বলা যাবে না। এই সময়ের মধ্যে যতটুকু লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ ছিল, তার অর্ধেকটাই মেলেনি। ম্যাচের পর ম্যাচ ক্রিকেটার বদলেও ভাগ্যে বদল আনা যায়নি। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৯ টেস্টে জয় তারই প্রমাণ। টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা পাওয়ার দুই যুগ সময়ে নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। ১৯৮২ সালে অভিষেকের পর প্রথম ২৪ বছরে তারা জিতেছিল ৪৭ টেস্টে। ওই সময়ের মধ্যে আবার তারা জিতেছিল একটি ওয়ানডে বিশ্বকাপও। তৈরি করেছিল তারা সনাথ জয়সুরিয়া, মুত্তিয়া মুরাধরন, মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারার মতো তারকাদের।

বাংলাদেশও পেয়েছে তারকা ক্রিকেটারদের। সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, মুশফিকুর রহিমের মতো নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানসহ ‘পঞ্চপাণ্ডবের’ আগমন ঘটেছিল দেশের ক্রিকেটে। তারপরও টেস্ট খেলার মেজাজটাই তৈরি হয়নি বাংলাদেশিদের। যার তরতাজা উদাহরণ সর্বশেষ ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়া।

মিনহাজুল আবেদীন নান্নু প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব নেন ২০১৬ সালে। এর আগে ৫ বছর তিনি ছিলেন নির্বাচক কমিটির সদস্য। তার মানে দাঁড়ায় সাবেক এই ক্রিকেটার দল নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সেই ২০১১ সাল থেকে। এর আগে, অর্থাৎ ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ৫৯ ক্রিকেটারের হয়েছিল টেস্টে অভিষেক। নান্নুর জমানায় মোট ৪৩ জন ক্রিকেটার পেয়েছিলেন টেস্ট ক্যাপ। শুধু নির্বাচক থাকাবস্থায় ৫ বছরে ১৯ এবং প্রধান নির্বাচক হিসেবে শেষ ৭ বছরে সুযোগ দিয়েছিলেন ২৪ জনকে। এত এত ক্রিকেটারকে সাদাপোশাকে খেলিয়ে দিয়েছেন ঠিক। আবার ছিটকে ফেলতেও সময় নেননি। তাই তো তাদের অনেকেই বড়জোর এক বা দুই টেস্ট খেলেই হারিয়ে গেছেন।

গাজী আশরাফ হোসেন লিপু নেতৃত্বাধীন নয়া নির্বাচক কমিটির অধীনে অভিষেক হয়েছে দুজন তরুণের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিলেট ও চট্টগ্রামে হওয়া দুই টেস্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন নাহিদ রানা এবং হাসান মাহমুদ। 

এত এত ক্রিকেটারকে সাদাপোশাক আর সবুজ ক্যাপ পরিয়ে মাঠে নামিয়ে দেওয়ার আগে নান্নুরা কতটা যাচাই-বাছাই করেছেন, তা নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। তাই তো অনেকেই অপরিপক্ব অবস্থায় কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। আর এক-দুবার ব্যর্থ হওয়া মানেই তো অচল হয়ে যাওয়া ওনাদের চোখে।

এই অতিমাত্রায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি স্বীকার করেছেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, ‘সব নির্বাচকদেরই নির্দিষ্ট ভাবনা থাকে। দেখা গেল কাউকে নেওয়া হয়েছে একটা ভাবনায়, সে আসলে বেঞ্চেই থেকে যাচ্ছে। কেউ বা আবার একেবারেই বাদ পড়ে যায়। দুটো বিষয়ের দিকেই নজর রাখতে হবে আমাদের। কেউ বাদ পড়ে গেলে তার দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে তাকে ট্রেনিং করিয়ে আবার তাকে একটা সুযোগ দেওয়া। যদি সেটা না হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে আমাদের এই নির্বাচনটা ভুল ছিল।’

নির্বাচকদের সাফল্য ও ব্যর্থতা ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে বলে মনে করেন লিপু, ‘নির্বাচকরা তখনই সফল হন, যখন একজন ক্রিকেটার পারফরম করে দলের প্রত্যাশা পূরণ করেন। তেমনিভাবে একজন ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল প্রমাণিত হয় যদি তিনি পারফর্ম করতে না পারেন। আমরা ব্যর্থ হই পরোক্ষভাবে, সেই ক্রিকেটার হয় প্রত্যক্ষভাবে।’

এক ম্যাচ খেলিয়ে কাউকে বাদ দেওয়ার পক্ষপাতী নন লিপু। তিনি বলেন, ‘বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সহজে আসা যায় না। অবশ্যই সুযোগ দেওয়া হয়। যদি তার সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান হই আমরা, তখন তাকে আমাদের ভাবনা থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তা করব। সেটাও আসলে নির্ভর করে পাইপলাইনে বিকল্প কেমন আছে সেটার ওপর। তবে এক ম্যাচ দেখেই কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে দীপু (শাহাদাত হোসেন), জাকির (হাসান) ও জয় (মাহমুদুল হাসান) সবাইকে দিয়েই চেষ্টা হয়ে গেছে। এখন কেউ যদি টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেকে টেস্টের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে, তখন তো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেই হবে।’

সবশেষ জাতীয় লিগে ৯ ইনিংসে ৫৬ গড়ে ৪৫৩ রান করেছিলেন সাদমান ইসলাম। ছিলেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকার দ্বিতীয়তে; যা দেখিয়ে নির্বাচকদের নজর কেড়ে জায়গা করে নেন শ্রীলঙ্কা সিরিজের টেস্ট স্কোয়াডে। তবে সুযোগ হয়নি খেলার। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচকের সোজা সাপটা জবাব, ‘একাদশ নির্বাচনে আমরা হস্তক্ষেপ করি না। তবে এটা নিয়ে আমরা কোচ ও অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলব। তাদের ভাবনা কী, সেটা জানতে চাইব। প্রয়োজনে “এ” দলে তাকে সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এখনই তার হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইতিমধ্যে যে দুজন ব্যাটসম্যানের ওপর ভরসা করা হয়েছিল, তারা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই পারফরমারদের সামনে সুযোগ অবশ্যই রয়েছে।’

ব্যর্থতার চাদরে ঢাকা শ্রীলঙ্কা সিরিজ শেষে ক্রিকেটারদের টেস্ট ভুলে আপাতত মনোযোগ জিম্বাবুয়ে সিরিজে। ঘরের মাঠে সীমিত সংস্করণের সিরিজ দিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু করবে তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত