প্রতিষ্ঠার ১৩ বছরেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) নেই ছাত্রলীগের কমিটি। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থি-ডানপন্থিসহ সব ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় কর্মকান্ড এবং কমিটি রয়েছে। কমিটি না থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের পরিচয়ে একাধিক পক্ষ ক্যাম্পাসে সক্রিয় রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘাতেও জড়াচ্ছে তারা।
ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের পরিচয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় একাধিক শিক্ষার্থী জানান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের কমিটি হয়েছে আরও আগে। তবে ববি কমিটির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বেশ কয়েকবার আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন দিবস পালনসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠানও হয় ববি ছাত্রলীগের ব্যানারে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কালের বিবর্তনে অনেকে হারিয়েও গেছেন। বিশশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে আধিপত্য বিস্তারের জন্য সংঘর্ষ-সংঘাতে জড়াচ্ছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কমিটি থাকলে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল-সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো। তা ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় ছাত্রলীগ পরিচয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে যুক্ত হলেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তারা আরও জানান, গত তিন বছরে ক্যাম্পাসে বড় ধরনের পাঁচটি সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষ। সর্বশেষ গত বছরের ৫ আগস্ট হল দখলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষে আহত হন অন্তত ১০ জন। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দুটি মামলা হয়। গত পাঁচ বছরে বিশ্ববদ্যালয়ে ছাত্রলীগের বিবদমান পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও হামলার ঘটনায় বন্দর থানায় অন্তত ১০টি মামলা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ববি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের চারটি গ্রুপ বিদ্যমান। তাদের মধ্যে রিদম-আবিদ গ্রুপ ও রক্তিম গ্রুপ ক্যাম্পাসে সক্রিয় থাকলেও অন্যরা খুব একটা সক্রিয় নয়। সম্প্রতি রাজু-রাফি নামে আরেকটি গ্রুপ আত্মপ্রকাশ করেছে। অনেক দিন ধরে ক্যাম্পাসে সক্রিয় নেই নাভিদ গ্রুপ।
ছাত্রলীগকর্মী রাজু মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের পেশিশক্তির প্রভাব থাকে তারা অন্য পক্ষকে দমন-পীড়ন করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। অনেকেই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, হামলা-দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। তবে সাংগঠনিক কাঠামো থাকলে এ রকম হতো না।’ নিজেও দুটি ‘মিথ্যা মামলার’ শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জানা গেছে, ববিতে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব প্রকট। তাই দলে-উপদলে বিভক্ত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সদিচ্ছার অভাব ও ছাত্রলীগ পরিচয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ায় কমিটি গঠনের বিষয়ে খুব ভেবেচিন্তে সামনে অগ্রসর হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তাই বারবার আশ্বস্ত করেও কমিটি দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া পাঁচ বছর একটানা ক্যাম্পাসে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাতের আধিপত্য ছিল। তখন থেকেই ক্যাম্পাসে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব প্রকট আকার ধারণ করে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এক বছর আগে ক্যাম্পাস রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েন সিফাত।
ছাত্রলীগকর্মী অমিত হাসান রক্তিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়, তাই স্থানীয় প্রভাব থাকবে। কমিটির বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা স্থানীয় মেয়র ও মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছে। কমিটির বিষয়ে আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি।’
ছাত্রলীগকর্মী মুবাশ্বির রিদম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ বরিশালের স্থানীয় রাজনীতির যে আবহ ছিল তার প্রেক্ষাপটে আমাদের কমিটি হচ্ছিল না। তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রতিনিধি দিয়েছেন। তারা আমাদের কমিটি নিয়ে আন্তরিক। আমরা কেন্দ্রের সঙ্গেও যোগাযোগ করছি। সব মিলিয়ে আমরা আশাবাদী।’
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ইউনিট। এটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়। আমরা এক যুগের অবসান ঘটিয়ে আশা করছি খুব শিগগির বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক কমিটির রূপদান করতে পারব।’
