রমজান মাস শেষের পথে। সাধারণত ঈদের বাজার জমে রোজার শেষের দিকে। কিন্তু এবার কুমিল্লার ঈদবাজারে ভিন্নচিত্র। গত বছরগুলোয় রমজানের এই সময়ে কুমিল্লার শপিং কমপ্লেক্স এবং মার্কেটগুলোতে থাকত উপচেপড়া ভিড়, নানান বয়সী মানুষের আনাগোনায় গমগম করত মার্কেটগুলো। আনন্দ নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে আসত শিশুসহ নানান বয়সের মানুষ। কিন্তু এ বছর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
বিশ রমজানের পরপরই ঈদের নতুন জামাকাপড় কেনা শেষ হতো অনেকের। কিন্তু এ বছর মার্কেটগুলোতে নেই তেমন ভিড়, পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঈদের নতুন জামাকাপড়, জুতা ও প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসলেও ক্রেতার দেখা পাচ্ছেন না মার্কেটগুলোর বিক্রেতারা। হতাশায় দিন পার করছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী। প্রায় ৬২ লাখ মানুষের বসবাস কুমিল্লা জেলায়। কুমিল্লা নগরীতে ছোট-বড় মিলে শতাধিক বহুতল মার্কেট ও বিপণিবিতান রয়েছে। উপজেলা সদরেও গড়ে উঠেছে মার্কেট ও বিপণিবিতান। কিন্তু শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই বেচাকেনায় ভাটা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে চললে প্রচুর টাকা লোকসান গুনতে হবে, ঈদ সামনে রেখে নিত্যনতুন পণ্যসামগ্রী দোকানে তুললেও ক্রেতা না থাকায় হতাশায় ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এর মূল কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মানুষ নিত্যদিন পরিবারের খাবারের জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে পরিবারের খাবারের জোগান দিতে। এর মধ্যে কমেছে মানুষের আয় রোজগার, এক দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে রোজগার কমে আসায় ঈদ আনন্দের আশা ছেড়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্যের জোগান দিতেই প্রতিটি পরিবার মাসের আয়ের পুরোটাই খরচ করছে। গতবারের চেয়ে এ বছর বেড়েছে প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের মূল্য। শতাংশ হারে গতবারের চেয়ে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ বেড়েছে প্রতিটি পণ্যের মূল্য। চাল, ডাল, তেল নুন, মাছ, মাংস, সবজি, মসলাসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। মানুষ ইফতার ও সাহরিতে একটু ভালো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে চায়, সেখানেও বাদ সেধেছে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনো রকমে ইফতার ও সাহরি সারছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের টেকা দায় হয়ে পড়েছে। জীবনধারণের উপযোগী প্রতিটি জিনিসের দাম গত বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তাই এবার ঈদের কেনাকাটায় পোশাকের পেছনে ব্যয় কম করছে মানুষ। কয়েক বছর করোনা মহামারীসহ নানা কারণে ব্যবসা ভালো হয়নি। তাই এবার ঈদ সামনে রেখে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
বেশ কয়েকজন ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ঈদ বাজারে নতুন জামাকাপড় নিয়ে আগ্রহ কম।
বিক্রেতারা বলছেন, এবার ঈদের বাজার খুব বেশি ভালো না। গত বছরের তুলনায় এবার ২০-৩০ শতাংশ বিক্রি কমেছে। মানুষ এবার কেনাকাটা কম করছে। হাতে টাকা নেই। ঈদের সময় অনেকে শখের বসেও পোশাক কেনে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে একেবারে প্রয়োজন ছাড়া কেউ মার্কেটে আসছে না। এলেও অল্প টাকার মধ্যে কেনাকাটা সারছে।
রোজার শেষ দিকে কুমিল্লার বড় বড় মার্কেটে ভিড় নেই, সব বয়সী মানুষ ঘুরছে ফুটপাত ও কমমূল্যের দোকানগুলোয়। গতকাল শুক্রবার কুমিল্লা নগরীতে ভিড় দেখা গেছে সবখানেই। তবে বেচাবিক্রি বেশি ছিল ফুটপাত ও মধ্যমসারির দোকানগুলোতে। সাধারণ মানুষ ঈদের জামাকাপড় কেনে এসব দোকান থেকে। ফুটপাত ও মধ্যমসারির তৈরি পোশাকের দোকান থেকেই ছেলেমেয়েদের জন্য জামাকাপড় কিনতে দেখা গেছে। এসব দোকানে নারীদের বিভিন্ন সাইজের ফ্রগ জামা পাওয়া যাচ্ছে ৩০০, ৫০০, ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। ছেলেদের প্যান্ট-শার্ট পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। জুতা, শাড়ি, পাঞ্জাবিও মিলছে সাধ্যের মধ্যে। মাসের শেষে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কোম্পানিগুলোর বেতন-বোনাস হওয়ায় বহুতল বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোতেও বিক্রি বেড়েছে কিছুটা। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা দিদারুল হক গত শুক্রবার বিকেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরছিলেন নতুন জামাকাপড় কিনতে। তিনি জানালেন মার্কেটের বড় দোকানগুলোতে দাম বেশি, তাই ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকেই ছেলেমেয়েদের জন্য জামাকাপড় নিয়েছেন। পাশাপাশি কথা হয় সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা আফসার মিয়ার সঙ্গে। স্ত্রীকে নিয়ে মার্কেটে এসেছেন। তিনি জানান, তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ঈদের কেনাকাটার জন্য ছেলেমেয়েদের চাহিদামতো টাকা দিয়ে দিয়েছেন। ছেলেমেয়েরা তাদের পছন্দমতো কিনে নেবে।
কুমিল্লা নগরীর ফুটপাতের এক ব্যবসায়ী নাজমুল জানান, বাচ্চাদের জামাকাপড়ের ব্যবসা করেন। রোজার শেষ দিকে বেচা বিক্রি ভালো।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সংগঠক অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বলেন, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, মানুষের বাড়তি আয় না থাকার কারণে ঈদবাজারের প্রতি বিমুখ হচ্ছে।
কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিকুল্লাহ খোকন বলেন, অন্য বছরগুলোয় তুলনা এবার ক্রেতা উপস্থিতি কম। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের ঈদের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে।
