জিম্মি নাবিক রোকনের বাড়িতে নেই ঈদ আনন্দ 

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫১ পিএম

সোমালিয়ান দস্যুদের হাতে জিম্মি এমভি আবদুল্লার নাবিক রোকনের বাড়িতে নেই ঈদ আনন্দ। ঈদের দিনেও জ্বলেনি চুলা। মায়ের চোখে মুখে অপেক্ষা। মা-বাবা সারাদিন নামাজ পড়ছেন আর দোয়া করছেন ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য। 

বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) ঈদের দিন দুপুরবেলা রোকনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রুকনের মা ঘরের এক কোণে শুয়ে তসবি পড়ছেন আর ছেলের জন্য দোয়া করছেন। ছেলে যেন তার কোলে ফিরে আসে। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে। 

সাগরে ডাকাতি হওয়া জাহাজের নাবিক থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রুকনের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণায় মায়ের আহাজারি আজও থামেনি। ছেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারের মাঝে নাবিককে ফিরে পাওয়ার আকুতি বিরাজ করছে। এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে নেত্রকোণা জেলার সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের বাঘরোয়া গ্রামে। তিন ছেলের মাঝে ছোট ছেলে রোকন। 

রোকনের মা লুৎফুর নাহার জানান, জাহাজ মালিকদের পক্ষ থেকে শুধু সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগেও জাহাজ মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ঈদের আগে রোকন বাড়ি ফিরবে সেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন তিনি। আল্লাহর কাছে আঁচল পেতে ছেলে ভিক্ষা চাইছেন। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মিরাজ আলীর স্ত্রী লুৎফুর নাহার।

এদিকে রোকনের বাবা মিরাজ আলী বলেন, যেখানে আমার ছেলে নেই সেখানে কিসের ঈদ আর কিসের আনন্দ। আমার ছেলে ছাড়া পুরো পরিবারটা শূন্য লাগছে। আমার পরিবারের সবাই এখন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। একদিকে চিন্তায় আমার সন্তান সম্ভবা পুত্রবধূ অসুস্থ হয়ে গেছে। অন্যদিকে রোকনের মা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। 
 
এদিকে রুকনের স্ত্রী তানিয়া বাবার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর গ্রামে সন্তান সম্ভবা। তারও যেন একই অবস্থা জানালেন স্বজনরা।

জানা গেছে, নেত্রকোণার সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের বাঘরোয়া গ্রামের কৃষক মিরাজ আলী ও লুৎফুর নাহারের ৫ সন্তানের মধ্যে ৪ নম্বর হলেন মো. রোকন উদ্দিন।  

তারা তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় ছেলে রুকন। বাবা মা বড় ভাই কাজ করে রুকনকে পড়াশোনা করিয়েছিলেন। নিজে পড়াশোনা না করায় ছোট ভাইকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে কৃষি কাজ করেছেন তারা। পড়াশোনার টাকা জোগাড় করতে করেছেন ধার দেনা। ভাইয়ের চাকরি হওয়ায় সকলের আশা ছিলো একদিন সব সমস্যা দূর হবে। কিন্তু এমনটি হবে জানা ছিল না। 

সকলের বড় ভাই কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, মালিক পক্ষ গতকাল ফোন দিলেও আজ ঈদের দিন নেননি কোন খোঁজ। সেইসঙ্গে দেননি ভাইয়েরও কোনো খোঁজ। তাদের কথাই বিশ্বাস করে বসে আছি অন্ধের মতো। কোথায় আছে কেমন আছে আমাদের জানার সুযোগ নেই। তাদের ভরসায় বসে আছি। 

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ভালো শিক্ষার্থী হওয়ায় রোকন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার পাশ করেন ২০১৩ সালে। পরে ২০১৫ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। গত বছর চৈত্র মাসে মধুপুরে এক স্কুল শিক্ষিকার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর গত ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে বর্তমান শিপ কোম্পানিতে যোগদান করেন। 

উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহর সেকেন্ড অফিসার মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রথম অস্ত্র ঠেকিয়েছিল সোমালিয়ান জলদস্যুরা। সেদিন দুপুর তিনটা ১২ মিনিটে অস্ত্র ঠেকানোর পর জাহাজের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিটাডেলে আশ্রয় নেয়া সব নাবিকদের ব্রিজে আসার নির্দেশনা দেন। সেকেন্ড অফিসার ও ডিউটি ইঞ্জিনিয়ার সিটাডেলে আশ্রয় নেয়নি। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যরাকাদে নোঙ্গর করে। এখনো একই এলাকায় অবস্থান করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত